বিউটিফুল ইসলাম, পর্ব 11 :আমাদের আত্মা

মানুষের জীবন আর দেহের সাথে যে রহস্যময় অস্তিত্ব মিশে আছে, তাকে আমরা ‘আত্মা’ বলে জানি। আত্মা সম্পর্কে আলোচনা মানব সমাজে বহু আগে থেকেই বিদ্যমান, তবে এর প্রকৃত ধারা এবং এর গূঢ় সত্যতা নিয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকে আলোচনা অল্প। ইসলামিক পরিপ্রেক্ষিতে আত্মা বা ‘রুহ’ মানবজীবনের একটি অপরিহার্য অংশ, যা মানুষের দেহে জীবনের স্পন্দন সৃষ্টি করে এবং মৃত্যুর পরও এর অস্তিত্ব অব্যাহত থাকে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে আত্মার অস্তিত্ব, এর কার্যাবলী এবং এর প্রভাব সম্পর্কে সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে।

আত্মার সংজ্ঞা ও তার গুরুত্ব

আত্মা বা রুহ শব্দটি আরবি ভাষা থেকে এসেছে, যা অর্থনৈতিকভাবে জীবনদানের অর্থ বহন করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, "আর স্মরণ করো, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের বলেন, আমি মানুষ সৃষ্টি করতে যাচ্ছি শুকনো ঠনঠনে কালচে মাটি থেকে। অতঃপর যখন আমি তাকে সুঠাম করব এবং তাতে আমার পক্ষ থেকে রুহ সঞ্চার করব, তখন তোমরা তার প্রতি সিজদাবনত হয়ো।" (সুরা : হিজর, আয়াত : ২৯)। এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, আত্মা হল সেই জীবনীশক্তি যা মানবদেহে সঞ্চারিত হলে জীবন শুরু হয় এবং যার বিদায় হলে মৃত্যু ঘটে।

আত্মার প্রকৃতি ও মানব জীবনে এর প্রভাব

আত্মার প্রকৃতি বোঝা সাধারণ মানুষের জন্য সহজ নয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, "তারা তোমাকে আত্মা সম্পর্কে প্রশ্ন করে। তুমি বলো, আত্মা আমার প্রতিপালকের আদেশবিশেষ। আর তোমাদের সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে।" (সুরা : ইসরাইল, আয়াত : ৮৫)। এই আয়াতের মাধ্যমে বোঝা যায় যে, আত্মা মানুষের সীমিত জ্ঞানের পরিসরের বাইরে। এটি আল্লাহর একটি নির্দেশবিশেষ, যা মানবদেহে সঞ্চারিত হলে তা জীবিত হয়ে ওঠে।

আত্মার জগৎ ও তার কার্যাবলী

আত্মা মানুষের দেহে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অবস্থান করে, যা আল্লাহর আদেশে নির্ধারিত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, "আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারো মৃত্যু হতে পারে না, যেহেতু সেটার মেয়াদ সুনির্ধারিত।" (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৪৫)। এই আয়াতের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে, প্রতিটি মানুষের আত্মার জন্য নির্দিষ্ট একটি সময় রয়েছে, যার পর মৃত্যুর মাধ্যমে আত্মা দেহ থেকে পৃথক হয়।

আত্মার পরিচয় ও তার সম্পর্ক

আত্মার একটি পরিচয় ঘটে আত্মার জগতে, যা পৃথিবীর জীবনে বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতির বন্ধনে পরিণত হয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, "আত্মা স্বভাবজাত সমাজবদ্ধ। সেখানে যেসব রুহ পরস্পর পরিচিতি লাভ করেছিল, দুনিয়াতে সেগুলো সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকে। আর সেখানে যেগুলো অপরিচিত ছিল, এখানেও তারা অপরিচিত।" (মুসলিম, হাদিস : ৬৬০২)। এই হাদিসটি আমাদের আত্মার সম্পর্ক ও এর পরিচয় সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা দেয়।

আত্মার পরিচর্যা ও এর প্রভাব

মানুষের কৃতকর্ম আত্মার ওপর প্রভাব ফেলে। নেক আমল, ঈমান, ও আল্লাহর নির্দেশিত পথে চললে আত্মা পবিত্র থাকে। অপরপক্ষে, পাপাচারে লিপ্ত হলে আত্মা অপবিত্র হয়ে যায়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, মৃত্যুর সময় ফেরেশতা মুমিন আত্মাকে পবিত্র বলে আহ্বান করেন এবং আল্লাহর রহমত ও সুঘ্রাণের সুসংবাদ দেন। পাপাচারী আত্মাকে তারা নিকৃষ্ট আত্মা হিসেবে বর্ণনা করেন এবং দুঃসংবাদ দেন। এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে, আমাদের কর্মই আমাদের আত্মার প্রকৃতি নির্ধারণ করে।

পরকালীন ফলাফল ও আত্মার অবস্থান

পরকালে আত্মার পরিণাম নির্ভর করে তার পবিত্রতা ও কার্যাবলীর ওপর। পবিত্র আত্মার অধিকারীরা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে এবং জান্নাতের অধিকারী হয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, "হে প্রশান্ত আত্মা, তুমি তোমার রবের কাছে ফিরে এসো সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। আর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো।" (সুরা : ফাজর, আয়াত : ২৭-৩০)। এই আয়াত আমাদেরকে জানিয়ে দেয় যে, পবিত্র আত্মার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে জান্নাতের সুসংবাদ রয়েছে।

বিজ্ঞান ও আত্মার সম্পর্ক

বিজ্ঞান আত্মার প্রকৃতি ও কার্যাবলী সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হয়নি। একটি পাখির উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, জীবিত ও মৃত পাখির মধ্যে শারীরিক কোনো পার্থক্য নেই। তবে আত্মার বিদায় হলে পাখি মারা যায়। জীব, রসায়ন, পদার্থ, জীব বিজ্ঞান কোনোটিই আত্মার ব্যাখ্যা দিতে পারে না। জীবন ও আত্মা এক নয়; জীবন একটি শক্তি যা আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, আর আত্মা হলো আমরা নিজেরা।

আত্মার স্বাধীনতা ও ইসলামের শিক্ষা

দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে মানবসত্তা গড়ে ওঠে। যেমন দেহের উন্নতি ও সুস্থতার জন্য প্রয়োজন নির্মল পরিবেশ ও সুষম খাদ্য, তেমনি আত্মার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন নির্মোহ অবস্থা ও ইবাদত। ইসলামের প্রথম বাক্য হলো কালেমা তাইয়েবা, যা মানুষের আত্মিক শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দিয়ে প্রকৃত স্বাধীনতা প্রদান করে। কালেমার অর্থ হলো, "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ" - আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই, এবং মুহাম্মাদ (সা.) হলেন আল্লাহর প্রেরিত রাসুল। এই কালেমা মানুষের আত্মাকে শুদ্ধ করে এবং আল্লাহর পথে পরিচালিত করে।

আত্মার স্বাধীনতা ও সমতা

আত্মার স্বাধীনতা মানুষকে জাতিভেদ ও বর্ণভেদ থেকে মুক্ত করে। ইসলাম সবাইকে এক কাতারে নিয়ে আসে। রাসুলুল্লাহ (সা.) দাসকে সন্তান বানিয়েছেন, ক্রীতদাসকে ভাইয়ের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন, এবং গোলামকে সেনা অধিনায়ক করেছেন। ইসলামের স্বাধীনতার বাণী বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে, যা মানবজাতিকে প্রকৃত স্বাধীনতা ও শান্তির পথ দেখিয়েছে।

আত্মার মূল্যায়ন ও তার গূঢ় তাৎপর্য

আত্মা সম্পর্কে বিশদ আলোচনার মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি যে, এটি একটি অনন্য ও জটিল বিষয়। আত্মা হল সেই অন্তর্গত সত্তা যা আমাদের দেহের সাথে সংযুক্ত থাকে, যা আমাদের জীবিত রাখে এবং মৃত্যুর পরও অমর থাকে। ইসলামে আত্মার গুরুত্ব অপরিসীম, এবং এটি মানবজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আত্মার প্রকৃতি, এর কার্যাবলী এবং এর পরিণতি সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করতে হলে আমাদের পবিত্র কোরআন ও হাদিসের গভীরে যেতে হবে।

আত্মা হল আমাদের অস্তিত্বের এক অনন্য অংশ, যা দেহের সাথে সম্পৃক্ত থাকে এবং আমাদের জীবিত রাখে। এটি আল্লাহর আদেশে সৃষ্ট এবং তারই অধীনে পরিচালিত। আত্মার প্রকৃতি এবং এর কার্যাবলী সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করতে হলে আমাদের আল্লাহর কিতাব ও নবীর সুন্নাহ অনুসরণ করতে হবে। আত্মার পরিচর্যা এবং তার পবিত্রতা বজায় রাখা আমাদের দায়িত্ব, যা আমাদের পরকালের জীবনেও প্রভাবিত করবে। ইসলামে আত্মার এই গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, এবং এটি আমাদের জীবনের এক অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়।

Thanks For Comment we are reply soon as possible.

Previous Post Next Post