বিউটিফুল ইসলাম, পর্ব 13 : সৎ সাহস

ইসলামে সৎ সাহস এক মহৎ গুণ হিসেবে বিবেচিত হয়। একজন মুমিনের জীবনে এই গুণের অপরিসীম প্রয়োজন রয়েছে। আল্লাহর পথে চলতে এবং সমাজের নানা অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হলে সৎ সাহস অপরিহার্য। এই গুণের অভাবে একজন মুসলিম আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে চলতে পারে না এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে অসফল হয়। ইসলামে সৎ সাহসের গুরুত্ব বিভিন্ন আয়াত এবং হাদিসে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যা একজন মুমিনের চরিত্র গঠনের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

সৎ সাহসের গুরুত্ব

সৎ সাহস হলো এমন এক অভ্যন্তরীণ শক্তি যা মুমিনকে আল্লাহর পথে অবিচল থাকতে এবং তাঁর বিধান অনুসারে জীবন পরিচালনা করতে উৎসাহিত করে। এটি এমন এক গুণ যা মানুষকে সত্যের পথে অবিচল থাকতে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সহায়তা করে। সুরা তাওবা আয়াত ১৮-তে আল্লাহ তাআলা বলেন, 'তারাই তো আল্লাহর মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ করবে, যারা ঈমান আনে আল্লাহ ও আখিরাতে এবং সালাত কায়েম করে, জাকাত দেয় আর আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না।'

এই আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, একজন খাঁটি মুমিনের জীবনে সৎ সাহস অপরিহার্য। সৎ সাহস ছাড়া মুমিনের পক্ষে আল্লাহর বিধান পালন করা এবং তাঁর পথে সংগ্রাম করা সম্ভব নয়।

ইসলামের বীরত্বগাথা: সাহসী মুজাহিদদের দৃষ্টান্ত

ইসলামের ইতিহাসে সাহসী মুজাহিদদের বীরত্বগাথা এক অনন্য দৃষ্টান্ত। যুগে যুগে এই সাহসী মুজাহিদদের মাধ্যমেই ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাদের সৎ সাহস এবং দৃঢ়চিত্তের কারণে ইসলামের পতাকা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে উড়ানো সম্ভব হয়েছে। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) নিজেই ছিলেন এক অসামান্য সাহসী পুরুষ। আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, ‘নবী (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সুদর্শন এবং সর্বাপেক্ষা সাহসী ও দানশীল।’ (বুখারি, হাদিস : ২৮২০)।

ইসলামের ইতিহাসে খন্দক যুদ্ধের ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, যেখানে নবী করীম (সা.) এবং তাঁর সাহাবীরা অবিচল সাহসের সাথে শত্রুর মোকাবিলা করেছিলেন। মদিনা রক্ষার জন্য খন্দক (পরিখা) খননের সময় তাদের সাহস এবং দৃঢ়তা ইসলামের বিজয়ের কারণ হয়ে ওঠে।

হক কথা বলা: সর্বোত্তম জিহাদ

ইসলামে হক কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ হিসেবে গণ্য হয়। নবী (সা.) বলেছেন, ‘সর্বোত্তম জিহাদ হলো অত্যাচারী শাসকের সামনে ইনসাফপূর্ণ কথা বলা।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২১৭৪)। এই হাদিসের মাধ্যমে বোঝা যায় যে, একজন মুমিনের জীবনে সৎ সাহস কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য একজন মুমিনকে সৎ সাহস থাকতে হবে।

এই সাহসিকতার গুণ অর্জন করা জরুরি, কারণ শয়তান সর্বদা মানুষকে সত্যের পথে বিচ্যুত করার চেষ্টা করে। ইসলামে আত্মত্যাগের মূলে রয়েছে এই সৎ সাহস, যা একজন মুমিনকে সত্যের পথে অবিচল রাখে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের দিকে নিয়ে যায়।

ইবরাহিম (আ.) এর আত্মত্যাগ

ইসলামের ইতিহাসে ইবরাহিম (আ.) এর আত্মত্যাগ এক অসামান্য দৃষ্টান্ত। শয়তান যখন ইবরাহিম (আ.) কে তাঁর পুত্রকে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী উৎসর্গ করতে বাধা দেয়, তখন ইবরাহিম (আ.) সাহসের সাথে শয়তানের প্রতিরোধ করেন। শয়তানকে কংকর নিক্ষেপ করে তিনি আল্লাহর পথে চলার প্রতিজ্ঞা বজায় রাখেন এবং তাঁর পুত্রকে উৎসর্গ করেন। এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে, আল্লাহর পথে চলতে হলে সৎ সাহস অপরিহার্য।

মুসলিম সমাজে সৎ সাহসের প্রভাব

মুসলিম সমাজে সৎ সাহস একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ। এই গুণের অনুপস্থিতিতে মুসলিম সমাজ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন বিভ্রান্তির শিকার হয়। মুসলিম উম্মাহর এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হলে সৎ সাহসকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে চর্চা করতে হবে।

আজকের সমাজে মুসলিম উম্মাহকে নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। শত্রুরা ইসলামকে দুর্বল করার জন্য নানা ষড়যন্ত্র করছে। এমন পরিস্থিতিতে মুসলিম উম্মাহর সামনে সৎ সাহসের উদাহরণ হয়ে দাঁড়ানো অপরিহার্য। ইসলামকে রক্ষা এবং সমাজের অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হলে সৎ সাহসকে জীবনযাত্রার অংশ করে নিতে হবে।

বর্তমান সমাজে সৎ সাহসের প্রয়োজনীয়তা

বর্তমান সমাজে সৎ সাহসের প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। সামাজিক এবং ধর্মীয় বিষয়ে ন্যায়নিষ্ঠ অবস্থান গ্রহণ করতে হলে সৎ সাহসের বিকল্প নেই। বর্তমান সমাজে অন্যায়, অবিচার এবং বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হলে মুমিনদের মধ্যে সৎ সাহস গড়ে তুলতে হবে।

একজন মুমিনের জীবনে সৎ সাহস এক অপরিহার্য গুণ, যা তাকে আল্লাহর পথে অবিচল থাকতে এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়তা করে। ইসলামের ইতিহাসে সৎ সাহসের উদাহরণে ভরপুর, যা মুমিনদের জন্য এক অসামান্য দৃষ্টান্ত। তাই বর্তমান সমাজে সৎ সাহসের চর্চা করা এবং তা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত করা জরুরি।

সৎ সাহস একজন মুমিনের জীবনে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে এক অপরিহার্য গুণ। ইসলামে সৎ সাহসের গুরুত্ব বিভিন্ন আয়াত এবং হাদিসে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ইসলামের ইতিহাসে সাহসী মুজাহিদদের বীরত্বগাথা এবং নবী করীম (সা.) এর জীবন সবার জন্য এক অনুপ্রেরণা। বর্তমান সমাজে সৎ সাহসের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি, কারণ সামাজিক এবং ধর্মীয় বিষয়ে ন্যায়নিষ্ঠ অবস্থান গ্রহণ করতে হলে এই গুণের বিকল্প নেই। তাই, মুসলিম উম্মাহর প্রত্যেককে সৎ সাহসের চর্চা করতে হবে এবং তা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিফলিত করতে হবে।

Thanks For Comment we are reply soon as possible.

Previous Post Next Post