ইসলামবিদ্বেষ ও সেক্যুলার আগ্রাসনের প্রেক্ষিতে মুসলিমদের পথচলা

অড্রে লর্ডের বিখ্যাত উক্তি “The Master's Tools Will Never Dismantle the Master's House” বা “মনিবের যন্ত্রপাতি দিয়ে কখনো মনিবের ঘর ভাঙ্গা যাবে না”—এই বাক্যাংশটি শুধু তার নিজস্ব আদর্শিক অবস্থান থেকেই নয়, বরং শোষক ও শোষিতের যেকোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। এই ধারণাটি আজকের মুসলিম বিশ্বে চলমান রাজনৈতিক ও আদর্শিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

কলোনিয়াল আগ্রাসন ও আমাদের আজকের বাস্তবতা

কলোনিয়াল শাসকদের একটি অন্যতম কৌশল ছিল শাসিত জাতির ওপর নিজেদের আদর্শ ও সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়া। তারা যখন ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ফিরে গেল, তখন ক্ষমতার মসনদে বসিয়ে গেল এমন গোষ্ঠীগুলিকে যারা ছিল তাদের অনুসারী, যাদের চিন্তা ও আদর্শ ঔপনিবেশিকদের মতো। এই প্রক্রিয়াটি কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল গভীরভাবে পরিকল্পিত। তারা বুঝে গিয়েছিল, যদি আদর্শিকভাবে আমাদের নিজেদের তৈরি করা যায়, তবে সামরিক শাসন ছাড়াই আমাদের শোষণ সম্ভব।

আজকের বাংলাদেশেও আমরা সেই একই বাস্তবতার সম্মুখীন। সেক্যুলার শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে আমাদের জাতিগত, সাংস্কৃতিক, ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে চাপা দেওয়ার প্রচেষ্টা চলছে। এই সেক্যুলার শাসনব্যবস্থা হলো সেই মনিবের যন্ত্রপাতি, যার মাধ্যমে আমাদের মানসিকভাবে বন্দী রাখা হয়েছে।

গণতন্ত্র ও সেক্যুলার শাসনের সীমাবদ্ধতা

গণতন্ত্র এবং সেক্যুলার শাসনব্যবস্থা এমন এক কাঠামো, যা মূলত ঔপনিবেশিক মনিবদেরই স্বার্থরক্ষায় প্রতিষ্ঠিত। আমাদের সমাজে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে যে, ইসলামের আদর্শে রাজনীতি করতে হলে গণতন্ত্র ও সেক্যুলার শাসনের পথেই হাঁটতে হবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, এই শাসনব্যবস্থা মুসলিম উম্মাহর জন্য কখনোই কার্যকর হয়নি। এই শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো পশ্চিমা আধিপত্য বজায় রাখা এবং মুসলিমদের রাজনৈতিক চিন্তাকে নিয়ন্ত্রিত রাখা।

যখন মুসলিমরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, তখন তারা মূলত সেই মনিবের খেলাতেই মেতে ওঠে, যে খেলায় তাদের পরাজয় অনিবার্য। কারণ এই পদ্ধতিগুলো কখনোই ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তৈরি হয়নি। বরং এগুলো এমনভাবে গঠিত হয়েছে যাতে মুসলিমদের ক্ষমতা লাভের সম্ভাবনা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়।

ইসলামী পুনর্জাগরণ ও সঠিক পথের সন্ধান

গত একশো বছর ধরে মুসলিম উম্মাহ বিভিন্নভাবে পুনর্জাগরণের চেষ্টা করেছে। তৈরি হয়েছে বিভিন্ন মত ও পথ। তবে সবগুলো পথেই দেখা গেছে একটি সাধারণ দিক—পশ্চিমা গণতন্ত্র ও সেক্যুলার শাসনব্যবস্থার অনুসরণ। অথচ এ পথগুলো কখনোই মুসলিম উম্মাহর প্রকৃত রাজনৈতিক মুক্তি আনতে পারেনি।

উম্মাহর জন্য প্রয়োজন নিজেদের আদর্শের ভিত্তিতে একটি নতুন পদ্ধতির সন্ধান। যে পদ্ধতি তাদের নিজেদের প্রাচীন ঐতিহ্য ও মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠবে। সেই পদ্ধতির দিকে ফিরে আসার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত মুক্তি।

ইসলামের রাজনৈতিক আদর্শ ও তার বাস্তবায়ন

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যার মধ্যে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু পশ্চিমারা মুসলিমদের এই পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থাকে নির্দিষ্ট কিছু ধারায় সীমাবদ্ধ করে দিতে চায়। তারা চায় ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ও আধ্যাত্মিক জীবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক। তারা মুসলিমদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে অবৈধ ও অপরাধমূলক বলে আখ্যায়িত করতে চায়।

এই প্রেক্ষাপটে, মুসলিমদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজেদের রাজনৈতিক চিন্তাকে নতুনভাবে সংগঠিত করা। আমাদের বুঝতে হবে যে, ইসলামী রাজনীতি শুধু গণতন্ত্র ও সেক্যুলার শাসনব্যবস্থার পথে হাঁটতে বাধ্য নয়। বরং আমাদের উচিত নিজেদের পদ্ধতি ও কাঠামো তৈরি করা, যা ইসলামের মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবের বিপরীতে ইসলামের আত্মপরিচয়

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় ইসলামবিদ্বেষ একটি বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। মুসলিম উম্মাহর উপর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আঘাত আসছে—রাজনৈতিক, সামাজিক, ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে। কিন্তু এ আঘাতগুলো শুধু বাইরের নয়, আমাদের নিজেদের মধ্যেও এই বিষবৃক্ষের শিকড় ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের নিজেদের ভেতরেই সেক্যুলার চিন্তাভাবনার অনুপ্রবেশ ঘটেছে, যা আমাদের আদর্শিকভাবে বিভ্রান্ত করছে।

ইসলামের প্রকৃত আদর্শ থেকে বিচ্যুতি ঘটলে আমরা নিজেদের আত্মপরিচয় হারিয়ে ফেলব। তাই আমাদের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো নিজেদের আদর্শিক অবস্থানকে পুনরুদ্ধার করা। আমরা যেনো আবারও সেই মাটি ও সংস্কৃতির ওপর দাঁড়াতে পারি, যেটা আমাদের পূর্বসূরীদের শিকড়ের সাথে সংযুক্ত।

কীভাবে এই বাস্তবতা বদলাতে পারে?

১. আদর্শিক শিক্ষা ও আত্মচেতনা: আমাদের প্রয়োজন ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে শিক্ষার বিস্তৃতি। সঠিক শিক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করা জরুরি। আমাদের যুবসমাজকে ইসলামের প্রকৃত আদর্শের সাথে পরিচিত করতে হবে।

২. প্রতিষ্ঠান গঠন: আমাদের নিজেদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেদের চিন্তা ও কাজকে সংগঠিত করতে হবে। গণতান্ত্রিক ও সেক্যুলার শাসনব্যবস্থার বাইরে গিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ইসলামী জীবনব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

৩. রাজনৈতিক সচেতনতা: আমাদের রাজনৈতিক চিন্তাকে নতুনভাবে সংগঠিত করতে হবে। ইসলামের প্রকৃত রাজনৈতিক আদর্শকে সামনে রেখে কাজ করতে হবে।

৪. মিডিয়া ও প্রচারণা: আমাদের মিডিয়া ও প্রচারণার মাধ্যমে ইসলামের প্রকৃত আদর্শকে প্রচার করতে হবে। সেক্যুলার ও পশ্চিমা মিডিয়ার প্রভাব থেকে নিজেদের রক্ষা করে নিজেদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে হবে।

অড্রে লর্ডের উক্তিটি আজকের মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।  আমাদের নিজেদের আদর্শিক ভিত্তি ও পদ্ধতির দিকে ফিরে আসতে হবে। একমাত্র সেই পথেই আমরা আমাদের আত্মপরিচয় রক্ষা করতে পারব এবং ইসলামের প্রকৃত আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারব।

Thanks For Comment we are reply soon as possible.

Previous Post Next Post