আধুনিকতা ও ইসলাম: সংঘাতের ইতিহাস ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

আধুনিকতা (Modernity) আজ মানবসভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এটি বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ও প্রগতির মাধ্যমে আমাদের জীবনযাত্রাকে সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করেছে। কিন্তু এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে ধর্ম, বিশেষত ইসলাম, যা আধুনিকতার সঙ্গে এক মৌলিক সংঘাত সৃষ্টি করেছে। ইসলাম তার চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয় শিক্ষার মাধ্যমে ট্র্যাডিশানের প্রতি দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ, যা আধুনিকতার পরিবর্তনশীল প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক। এই সংঘাতের শিকড় ইতিহাসে যেমন গভীর, তেমনি এটি বর্তমানে আরও তীব্র রূপ ধারণ করেছে।

আধুনিকতার উত্থান: ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

আধুনিকতার শুরু ষোড়শ শতাব্দীতে, ইউরোপে রেনেসাঁ এবং রিফর্মেশানের মাধ্যমে। খ্রিস্টধর্মের প্রভাব কমানোর লক্ষ্যে সেক্যুলারিজমের উত্থান ঘটে, যা ধর্মকে ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায়। এই ধারাটি পরবর্তীতে প্রগতিবাদের ভিত্তি স্থাপন করে। যুক্তি ও অভিজ্ঞতাজাত পর্যবেক্ষণকে ধর্মের উপরে স্থান দেওয়ার ফলে মানব-মনের উপর আস্থা বৃদ্ধি পায়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির মাধ্যমে মানুষ নিজেকে ঈশ্বরতুল্য ভাবতে শুরু করে।

আধুনিকতা বনাম ট্র্যাডিশান

আধুনিকতার মূল দর্শন প্রগতিবাদ, যা বলে সময়ের সাথে সবকিছু উন্নত হচ্ছে। অন্যদিকে ট্র্যাডিশান অপরিবর্তনীয় মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যের প্রতি অঙ্গীকার। ইসলামের মতো ধর্মীয় ট্র্যাডিশান আধুনিকতার পরিবর্তনশীলতার প্রতি বাধা সৃষ্টি করে। ইসলাম মানব-জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা প্রদান করে, যা আধুনিকতার শিথিল ও আপডেটযোগ্য নীতির সাথে সাংঘর্ষিক।

আধুনিকতার ইসলাম-বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি

ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট চিন্তাবিদরা ইসলামকে পশ্চাৎপদ ও অযৌক্তিক বলে চিহ্নিত করেছে। ভলতেয়ারসহ অনেক দার্শনিক ইসলামকে এক স্বৈরাচারী ব্যবস্থার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ইসলামের প্রতি এই বৈরিতা একদিকে বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে, অন্যদিকে ঔপনিবেশিক শাসনের মাধ্যমে বাস্তব ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়।

ঔপনিবেশিক আধুনিকতা ও ইসলামের উপর আক্রমণ

ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো মুসলিম-বিশ্বের উপর আধিপত্য বিস্তার করে। তারা ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে, ইসলামী পোশাক ও পারিবারিক কাঠামো পরিবর্তন করে, এবং আরবি ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম থেকে সরিয়ে দেয়। এর ফলে মুসলিম সমাজের পরিচিতি, ঐতিহ্য, এবং মানসিকতা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।

ইসলাম বনাম আধুনিকতার দার্শনিক সংঘাত

ইসলাম মনে করে, জীবনের মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর মহান আল্লাহর দেওয়া বিধানেই রয়েছে। মহান আল্লাহর অস্তিত্ব ও তাঁর প্রতি আনুগত্য মানব-প্রকৃতির একটি সহজাত অংশ। অন্যদিকে, আধুনিকতা বলে সব প্রশ্নের উত্তর যুক্তি, অভিজ্ঞতা, এবং বিজ্ঞান থেকেই পাওয়া যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামের মৌলিক কাঠামোর সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

মডার্নিটির বিপদ ও প্রগতিবাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি

আধুনিকতা মানবজাতিকে প্রগতির নামে এক কল্পিত স্বর্গরাজ্যের স্বপ্ন দেখায়। তবে এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে যে বিভ্রান্তি ও সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তা স্পষ্ট। প্রযুক্তিগত উন্নতি যেমন পরিবেশ ধ্বংস করছে, তেমনি মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলছে। আধুনিকতার প্রভাব মানুষকে নৈতিক ও আত্মিক শূন্যতায় ঠেলে দিয়েছে।

ইসলাম: একটি আলোকিত বিকল্প

ইসলাম আধুনিকতার বিরুদ্ধে একটি টেকসই ও নৈতিক বিকল্প প্রদান করে। ইসলামী শিক্ষা মানুষকে আধ্যাত্মিক, নৈতিক, এবং সামাজিকভাবে উন্নত করে। এটি প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের ব্যবহারকে সমর্থন করে, তবে তা অবশ্যই নৈতিকতার সীমানায়। ইসলামী জীবনদর্শন অতীতের শিক্ষা থেকে প্রেরণা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে নির্দেশ দেয়, যা আধুনিকতার সীমাহীন পরিবর্তনের চেয়ে অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ।

আধুনিকতা ও ইসলাম একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। আধুনিকতা যেখানে পরিবর্তন ও প্রগতির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়ায়, ইসলাম সেখানে চিরন্তন সত্য ও ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আধুনিকতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মুসলিম উম্মাহকে তাদের বিশ্বাস, ঐতিহ্য, এবং মূল্যবোধকে দৃঢ়তার সাথে আঁকড়ে ধরতে হবে। প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, ইসলামী জীবনধারা গ্রহণের মাধ্যমেই আধুনিকতার বিপদ থেকে মুক্তি সম্ভব।


Thanks For Comment we are reply soon as possible.

Previous Post Next Post