বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ বা কালচারাল হেজেমনি একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক ধারণা হিসেবে উঠে এসেছে। ইতালির বিখ্যাত চিন্তাবিদ অ্যান্টোনিও গ্র্যামশির সাংস্কৃতিক হেজেমনি তত্ত্বের আলোকে এই ধারণাটি গভীরভাবে অনুধাবন করা যায়। গ্র্যামশির এই তত্ত্বটি মূলত ব্যাখ্যা করে, কিভাবে একটি প্রভাবশালী শ্রেণী সমাজে নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক কাঠামো তৈরি করে এবং জনগণকে ঐ কাঠামোর অধীনে স্বেচ্ছায় বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করে।
গ্র্যামশির মতে, পুঁজিবাদী সমাজে সর্বহারার বিপ্লব আসছে না, কারণ পুঁজিবাদী সমাজগুলোর সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে যেখানে জনগণের চিন্তাভাবনা ও মূল্যবোধ নিয়ন্ত্রিত হয়। এই সংস্কৃতি জনগণের মননকে এমনভাবে প্রভাবিত করে যে তারা বিদ্যমান শোষণ ও যুলুমের কাঠামোকে একপ্রকার ‘কমনসেন্স’ হিসেবে মেনে নেয়। বাংলাদেশে সেক্যুলার-প্রগতিশীল গোষ্ঠীর এই সাংস্কৃতিক আধিপত্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য
বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোতে সেক্যুলার-প্রগতিশীল গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিশেষভাবে বিদ্যমান। এই আধিপত্যের মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছে শিক্ষা, মিডিয়া, আইন এবং ‘অনুমোদিত ইসলাম’ এর উপর।
শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রভাব
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সেক্যুলার চিন্তাধারার প্রভাব অত্যন্ত প্রবল। মূলত শহুরে এলিট শ্রেণীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মীয় মূল্যবোধকে অবমূল্যায়ন করা হয়। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে উৎপাদিত একটি বিশাল জনগোষ্ঠী বয়ান প্রাপ্ত হয় যেখানে বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে উপেক্ষা করা হয়। এই প্রজন্মের মানসিকতা গড়ে উঠছে একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক কাঠামোর মধ্যে যা সেক্যুলার প্রগতিশীলতার ধারণাকে বৈধতা দেয় এবং ইসলামের মূল দর্শনকে বিপন্ন করে তোলে। এর ফলে মুসলিমদের প্রভাব কমে যায় এবং তারা নিজেদের সাংস্কৃতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
মিডিয়া ও জনগণের চেতনা নিয়ন্ত্রণ
গ্র্যামশির তত্ত্ব অনুযায়ী, মিডিয়া সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি প্রধান হাতিয়ার। বাংলাদেশের মিডিয়াও এই ব্যাপারে কোন ব্যতিক্রম নয়। মূলধারার গণমাধ্যমগুলো সেক্যুলার-প্রগতিশীল বয়ানকে প্রাধান্য দেয়, এবং অন্যদিকে মুসলিমদের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধকে নিয়ে নিয়মিতভাবে প্রশ্ন তোলে। মিডিয়ার এই প্রভাবের কারণে দেশের জনগণ একটি বিশেষ চিন্তাধারায় প্রভাবিত হয় এবং নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
মিডিয়া এমন একটি বাস্তবতা তৈরি করে যেখানে ধর্মীয় মূল্যবোধকে আধুনিকতার পরিপন্থী হিসেবে দেখানো হয় এবং সেক্যুলার মূল্যবোধকে মুক্তির পথ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এর ফলে মুসলিম সম্প্রদায়ের চেতনা ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে যায় এবং তারা নিজেদের ধর্মীয় মূল্যবোধকে সমাজের প্রগতির অন্তরায় হিসেবে দেখতে শুরু করে।
আইন ও রাজনৈতিক প্রভাব
বাংলাদেশের আইনী কাঠামোতেও সেক্যুলার প্রগতিশীলতার প্রভাব রয়েছে। দেশের বিভিন্ন আইন ও বিধিনিষেধ এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যা সেক্যুলার মূল্যবোধকে প্রাধান্য দেয় এবং ইসলামের মূলনীতিকে অবহেলা করে। এই আইনী কাঠামোর মাধ্যমে সেক্যুলার প্রগতিশীল গোষ্ঠী নিজেদের ক্ষমতা ও প্রভাব ধরে রাখে।
গ্র্যামশির মতে, সমাজের প্রভাবশালী শ্রেণী নিজেদের সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে গেলে সেই শ্রেণীর আইনী ক্ষমতা থাকতে হয়। বাংলাদেশে এই শ্রেণী তাদের আইনী ক্ষমতার মাধ্যমে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রেখেছে এবং তাদের সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে সুসংহত করেছে।
গ্র্যামশির সাংস্কৃতিক হেজেমনি তত্ত্বের বাংলাদেশি প্রেক্ষাপট
গ্র্যামশির সাংস্কৃতিক হেজেমনি তত্ত্বের আলোকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা যায়:
শ্রেণী বিভাজন ও সামাজিক প্রভাব: বাংলাদেশে শ্রেণী বিভাজনের মাধ্যমে প্রভাবশালী গোষ্ঠী নিজেদের সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। শহুরে এলিট শ্রেণী নিজেদের শিক্ষিত, আধুনিক এবং প্রগতিশীল হিসেবে উপস্থাপন করে এবং গ্রামের সাধারণ জনগণকে পশ্চাৎপদ ও অসভ্য বলে আখ্যায়িত করে। এর ফলে সাধারণ জনগণের মধ্যে একটি আত্মবিশ্বাসের অভাব তৈরি হয়, এবং তারা নিজেদের সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার জন্য কোন পদক্ষেপ নিতে পারে না।
রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য: বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে সেক্যুলার প্রগতিশীল গোষ্ঠীর প্রভাব অত্যন্ত প্রবল। এই গোষ্ঠী তাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে ধরে রাখার জন্য সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে ব্যবহার করে এবং সমাজের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এর ফলে দেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি অবস্থা তৈরি হয় যেখানে তারা নিজেদের ধর্মীয় অধিকার ও স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে পারে না।
মুসলিমদের সাংস্কৃতিক মুক্তির প্রয়োজন: বাংলাদেশের মুসলিমদের জন্য প্রয়োজন সাংস্কৃতিক মুক্তি। গ্র্যামশির তত্ত্ব অনুযায়ী, সাংস্কৃতিক আধিপত্য থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রথমে প্রভাবশালী শ্রেণীর তৈরি করা বয়ানকে বর্জন করতে হবে। বাংলার মুসলিমদের জন্যও একইভাবে সেক্যুলার-প্রগতিশীল গোষ্ঠীর তৈরি করা বাঙ্গালিত্ব, বাঙ্গালিয়ানা এবং বাঙ্গালি সংস্কৃতি ও ইতিহাসের বয়ানকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করতে হবে।
সাংস্কৃতিক হেজেমনির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ
বাংলাদেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক মুক্তি অর্জনের জন্য প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত এবং সচেতন প্রতিরোধ।
শিক্ষার পুনর্গঠন: মুসলিম সম্প্রদায়ের শিক্ষার পুনর্গঠনের মাধ্যমে সেক্যুলার-প্রগতিশীল গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে একটি নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে, যা ইসলামের মূলনীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে।
মিডিয়ার বিকল্প: সেক্যুলার-প্রগতিশীল গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি বিকল্প মিডিয়া তৈরি করতে হবে। এই মিডিয়া ইসলামের মূল্যবোধকে প্রাধান্য দেবে এবং সমাজের অন্যান্য শ্রেণীর মধ্যে ইসলামের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবে।
আইনের পুনর্গঠন: বাংলাদেশের আইনী কাঠামোকে ইসলামের মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ। আইনের মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষা করা যেতে পারে এবং তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধকে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।
সাংস্কৃতিক আন্দোলন: মুসলিম সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য একটি সুসংগঠিত আন্দোলন প্রয়োজন। এই আন্দোলন হবে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের পুনরুদ্ধারের জন্য।
বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গ্র্যামশির সাংস্কৃতিক হেজেমনি তত্ত্বের আলোকে যে সমস্যাগুলো উঠে এসেছে, তার সমাধান খুঁজতে হলে আমাদের সমাজের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কাঠামোর মূলকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। বাংলাদেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য প্রয়োজন একটি সাংস্কৃতিক মুক্তি, যা তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধকে রক্ষা করতে পারবে এবং তাদেরকে সেক্যুলার-প্রগতিশীল গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক আধিপত্য থেকে মুক্ত করতে পারবে।