বর্তমান বিশ্বে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ এবং বৈষম্যমূলক আচরণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে, মুসলিম নারীরা যাঁরা হিজাব বা নিকাব পরিধান করেন, তাঁরা এর চরম শিকার হচ্ছেন। এই বিদ্বেষ শুধু পশ্চিমা দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি আমাদের নিজেদের দেশেও প্রতিফলিত হচ্ছে। বাংলাদেশে, যেখানে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা, সেখানে ইসলাম ও ইসলামের বিধান পালনকারী মুসলিমদের উপর এক ধরনের সেক্যুলার-প্রগতিশীল হেজেমনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা মুসলিমদের মুক্ত চিন্তা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করছে।
সেক্যুলার-প্রগতিশীল হেজেমনি: আমাদের সমাজের বাস্তবতা
বাংলাদেশের সেক্যুলার-প্রগতিশীল গোষ্ঠী একটি সামাজিক কাঠামো তৈরি করেছে যেখানে ইসলামের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলা যায়, কিন্তু ইসলামের পক্ষে কথা বলা হলে সেটি বিদ্রোহ বা উগ্রবাদ হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই গোষ্ঠী তাদের কালচারাল হেজেমনি, অর্থাৎ সামাজিক আধিপত্য, ব্যবহার করে মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতিকে অবদমন করছে। ইসলামের বিরুদ্ধে কথা বললে সেটি মুক্ত চিন্তার উদাহরণ হিসেবে গৃহীত হয়, কিন্তু ইসলামের পক্ষে কথা বললে সেটি 'অপর' হিসেবে দেখা হয়।
মুসলিম নারীদের ওপর অত্যাচার: হিজাব ও নিকাবের কারণে বৈষম্য
মুসলিম নারীদের হিজাব বা নিকাব পরিধানের কারণে তাঁরা নানা ভাবে হয়রানি এবং বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে কর্মস্থল—সব জায়গাতেই এই বৈষম্যের চিত্র স্পষ্ট। মুসলিম নারীদের হিজাব পরিধানের কারণে তাঁদের ক্যাম্পাসে নানাভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে, তাঁদের শিক্ষা ও কাজের ক্ষেত্রে বাধা দেয়া হচ্ছে।
এই হয়রানি শুধুমাত্র শারীরিক বা মৌখিক হয় না; এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে, যা নারীদের স্বাভাবিক জীবনযাপনে প্রভাব ফেলে। অনেক মুসলিম নারীকে শুধু তাদের ধর্মীয় পোশাকের কারণে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। এমনকি, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে, যেটি সম্পূর্ণরূপে ইসলামবিদ্বেষী আচরণের উদাহরণ।
প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের প্রচেষ্টা: সেক্যুলার-প্রগতিশীলদের প্রতিরোধ
কিছু মুসলিম গোষ্ঠী এই ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করেছে। মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ, এবং প্রতিবাদ কর্মসূচীর মাধ্যমে তাঁরা তাদের দাবি তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রতিবারই তাঁদের প্রচেষ্টা সেক্যুলার-প্রগতিশীল গোষ্ঠীর কঠোর প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে।
সেক্যুলার-প্রগতিশীল গোষ্ঠী তাদের প্রভাব এবং ক্ষমতা ব্যবহার করে সরকারের সাথে মিলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেয়। ইসলামি প্রতিরোধমূলক কর্মসূচিকে 'উগ্রবাদী' আখ্যা দিয়ে, তারা সেগুলিকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। কোনো নিরীহ প্রতিবাদ বা সভা-সমাবেশকেও 'জঙ্গি' তকমা দিয়ে দমিয়ে রাখা হয়।
মিডিয়ার ভূমিকা: সত্যের পরিবর্তে বিকৃত বাস্তবতা
মিডিয়া এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেক্যুলার-প্রগতিশীল গোষ্ঠীর প্রভাবাধীন মিডিয়া মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজে লিপ্ত থাকে। তাদের কর্মকাণ্ডে মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার লঙ্ঘন করা হয় এবং তাদের বঞ্চনার শিকার হতে হয়। মিডিয়া সত্যকে বিকৃত করে জনগণের সামনে মিথ্যা প্রচার করে। তাদের তৈরি এই মিথ্যা প্রচার জনগণের মনে এমনভাবে প্রভাব ফেলে যে সাধারণ মানুষও ইসলামের প্রতি বিদ্বেষী হয়ে ওঠে।
একটি উদাহরণ হল, মুসলিম তরুণদের জঙ্গি প্রমাণ করার প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় তাদের ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক কার্যকলাপ, এমনকি তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাসকেও বিকৃতভাবে তুলে ধরা হয়। সামাজিক মাধ্যমে তাঁদের কর্মকাণ্ডকে বিকৃত করে তুলে ধরা হয়, যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ তৈরি করা যায়।
সামাজিক, রাজনৈতিক, ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য
সেক্যুলার-প্রগতিশীল হেজেমনি মুসলিমদের প্রতি সামাজিক, রাজনৈতিক, এবং প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য তৈরি করেছে। মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকারকে সীমিত করে তাঁদের উপর এক ধরনের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অত্যাচার চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। মুসলিম নারীদের হিজাব বা নিকাব পরিধানের স্বাধীনতা যেমন তাঁদের ব্যক্তিগত অধিকার, তেমনই এটি ইসলামের একটি মূলনীতি। কিন্তু সেক্যুলার-প্রগতিশীল গোষ্ঠী এটিকে একটি 'বিপদ' হিসেবে চিহ্নিত করে, যা সমাজের সুরক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য 'হুমকি' হিসেবে দেখা হয়।
ভবিষ্যতের করণীয়: মুসলিমদের অধিকারের জন্য সংগ্রাম
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য মুসলিমদের নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠিত হতে হবে। তবে, এই সংগ্রামকে করতে হবে শান্তিপূর্ণভাবে এবং দেশের আইনকানুনের ভেতরে থেকেই। আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে কাজে লাগিয়ে, মিডিয়া এবং সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলিকে ব্যবহার করে, আমাদের কথা জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে।
ইসলামী চিন্তার বিকাশ
এক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে ইসলামী চিন্তা ও গবেষণা কেন্দ্রগুলি। ইসলামী চিন্তাবিদ, আলেম, এবং সমাজবিদদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, যা মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার এবং সামাজিক অবস্থানের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিবর্তন করতে পারে।
শিক্ষার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি
শিক্ষার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধিও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ইসলামী শিক্ষাকে মূলধারার শিক্ষার সাথে যুক্ত করে, সমাজে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা প্রচার করতে হবে।
বৈষম্য বিরোধী আইন
সরকারকেও দায়িত্ব নিয়ে মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারীভাবে বৈষম্য বিরোধী আইন প্রণয়ন এবং প্রয়োগ করতে হবে যাতে কেউই ধর্মীয় পোশাক বা বিশ্বাসের জন্য হয়রানি বা বৈষম্যের শিকার না হন।
সেক্যুলার-প্রগতিশীল হেজেমনি মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করছে। মুসলিম নারীদের হিজাব বা নিকাব পরিধানের কারণে তাঁদের প্রতি যে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে, তা বন্ধ করতে হলে আমাদের একযোগে কাজ করতে হবে।
আমাদের প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন, যা মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার এবং সামাজিক অবস্থানকে সুরক্ষিত করবে। ইসলামের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের সবার প্রচেষ্টা প্রয়োজন, যাতে আমরা একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং ধর্মীয় সহনশীল সমাজ গড়ে তুলতে পারি।