সেক্যুলার-প্রগতিশীলদের কালচারাল এবং আমাদের ভুল ধারণার নিষ্পত্তি

বাংলাদেশের সমাজে সেক্যুলার-প্রগতিশীলদের কালচারাল হেজেমনি বা সামাজিক আধিপত্য একটি বহুল আলোচিত বিষয়। এই আধিপত্য ভাঙ্গার বিষয়ে আমাদের মধ্যে কিছু ভুল ধারণা কাজ করে, যা এড়িয়ে যাওয়া আমাদের জন্য জরুরি। সঠিকভাবে বুঝতে হবে সেক্যুলার-প্রগতিশীলদের কালচারাল হেজেমনি কী এবং এটি ভাঙ্গার জন্য আমাদের করণীয় কী।

কালচারাল হেজেমনি কী?

অনেকেরই ধারণা, সেক্যুলার-প্রগতিশীলদের আধিপত্য শুধুমাত্র শিল্পসাহিত্য, মিডিয়া, এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সীমাবদ্ধ। তবে এই ধারণা একেবারেই সঠিক নয়। কালচারাল হেজেমনি এর চেয়েও অনেক গভীর এবং ব্যাপক একটি বিষয়।

কালচারাল হেজেমনি বলতে বোঝানো হয়, সমাজের আলোচ্য বিষয় এবং ভাবনার দিকনির্দেশনা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। এটি সেই ক্ষমতা যা নির্ধারণ করে কোন বিষয়গুলো আলোচনায় আসবে এবং কোনগুলো উপেক্ষিত থাকবে। এ ক্ষমতার দ্বারা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, যেমন সেক্যুলার-প্রগতিশীলরা, জাতীয় চিন্তা, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা নিয়ন্ত্রণ করে।

তারা অতীতের ব্যাখ্যা তৈরি করে, বর্তমানের আলোচ্য বিষয় নিয়ন্ত্রণ করে, এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নির্ধারণ করে। এক্ষেত্রে, সাধারণ জনগণকে তাদের বেঁধে দেয়া সীমার মধ্যে থেকেই চিন্তা করতে হয়। এর বাইরে কোনো চিন্তা করলে তা বেআইনী হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়।

সেক্যুলার-প্রগতিশীলদের সামাজিক হেজেমনি ভাঙ্গার দুটি ভুল পদ্ধতি

সেক্যুলার-প্রগতিশীলদের সামাজিক হেজেমনি ভাঙ্গার প্রচেষ্টায় আমরা দুটি প্রধান ভুল পদ্ধতির সম্মুখীন হই। এই পদ্ধতিগুলো হলো: একীভূত হওয়া এবং ‘ইসলামী’ বিকল্প তৈরি করা।

ক) একীভূত হওয়া (Integration)

এই পদ্ধতি অনুযায়ী, সমাজে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার জন্য, সেক্যুলার-প্রগতিশীলদের বেঁধে দেয়া বাঙালিত্বের সংজ্ঞা এবং মানদণ্ড মেনে নিতে হয়। তারা বাঙালিত্বকে যে ভাবে সংজ্ঞায়িত করে, সেই সংজ্ঞাকে মেনে নিয়ে নিজেদের মধ্যে তা ধারণ করে নেওয়াই এই পদ্ধতির মূল লক্ষ্য। এখানে নিজেদের ‘বাঙালি’ প্রমাণ করতে গিয়ে সেক্যুলার-প্রগতিশীলদের সংজ্ঞার মধ্যেই আবদ্ধ থেকে তাদের আধিপত্যকে স্বীকার করে নিতে হয়।

এই পদ্ধতি যে ফলপ্রসূ নয়, তা স্পষ্ট। কারণ, এই পথে চললে নিজেদের মধ্যে বিকৃতি আসার সম্ভাবনা থাকে এবং বিদ্যমান সামাজিক পরিবর্তন তেমনভাবে সম্ভব হয় না।

খ) ‘ইসলামী’ বিকল্প তৈরি

এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, সেক্যুলার-প্রগতিশীলদের প্রতিটি কাজের জন্য একটি ‘ইসলামী’ বিকল্প তৈরি করতে হবে। যেমন, ইসলামী গান, সিনেমা, সাহিত্য, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি, এবং মিডিয়া। যদিও কিছু ক্ষেত্রে ইসলামী বিকল্প তৈরি সম্ভব, তবে সামগ্রিকভাবে এ প্রচেষ্টা কৌশলগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ। কারণ, আমাদের দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতার অভাবের কারণে, সেক্যুলার-প্রগতিশীলদের সাথে পাল্লা দিয়ে এসব ক্ষেত্রে সফল হওয়া কঠিন।

এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে গেলে, ইসলামী সংস্কৃতির সারমর্মকে ধরে রাখা এবং সেক্যুলার চর্চার নেতিবাচক প্রভাব থেকে নিজেদের রক্ষা করা বেশ কঠিন। এর ফলে ‘ইসলামী’ বিকল্প তৈরি করতে গিয়ে ইসলামিক মূল্যবোধের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

যেমন, কওমী মাদ্রাসা থেকে দাওরা হাদীস করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া তরুণদের মধ্যে ‘জাতে ওঠার’ প্রবণতা দেখা যায়। এই তরুণরা প্রগতিশীল সামাজিক আবহে নিজেদের পরিচিতি টিকিয়ে রাখার জন্য ধীরে ধীরে ইসলামের মূল চেতনাকে উপেক্ষা করে সেক্যুলার চর্চায় লিপ্ত হতে বাধ্য হয়। ফলে ইসলামী বিকল্প তৈরির চেষ্টা আসলে মুসলিম পরিচয়ের ক্ষতির কারণ হতে পারে।

বাস্তবিকভাবে কী করা উচিত?

সেক্যুলার-প্রগতিশীলদের সামাজিক আধিপত্য ভাঙ্গার সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি হলো তাদের সামাজিক বৈধতাকে আক্রমণ করা। অর্থাৎ, বাঙালি সংস্কৃতি, চেতনা, ইতিহাস, নৈতিকতা এবং রাজনীতির যেসব বয়ান তারা তৈরি করেছে, সেগুলোকে সবদিক থেকে চ্যালেঞ্জ করা এবং সেগুলোর ভুল ব্যাখ্যা বের করে জনসাধারণের সামনে তুলে ধরা।

মেরুকরণ ও গ্রহণযোগ্যতা

সেক্যুলার-প্রগতিশীলরা যে মেরুকরণ তৈরি করেছে, সেটিকে ব্যবহার করে সমাজের গ্রহণযোগ্য আলোচনার সীমাকে ইসলামি চিন্তার দিকে নিয়ে আসা উচিত। মানুষের রাজনৈতিক চিন্তাধারা এবং ওয়ার্ল্ডভিউ বদলানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে, সেক্যুলার-প্রগতিশীলদের বেঁধে দেয়া সীমার বাইরে গিয়ে মুসলিমদের রাজনৈতিক চিন্তা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন গঠন করার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যেতে পারে।

ডিজিটাল মিডিয়া ও প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার

যদিও ইসলামী বিকল্প তৈরির প্রচেষ্টা সামগ্রিক কৌশল হিসাবে ত্রুটিপূর্ণ, তবে ডিজিটাল মিডিয়া এবং অন্যান্য প্ল্যাটফর্মগুলির যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে কিছু ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, জনপ্রিয় পডকাস্ট বা নিজস্ব নিউজ পরিবেশনার মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিকল্প চিন্তা ছড়িয়ে দেয়া যেতে পারে।

বাস্তবায়ন পরিকল্পনা

প্রথমত, সামাজিক মিডিয়া এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলিতে সেক্যুলার-প্রগতিশীলদের বয়ানের বিরুদ্ধে প্রচার চালানো উচিত। ইসলামের প্রকৃত ইতিহাস এবং সংস্কৃতিকে তুলে ধরে মানুষের চিন্তাধারার পরিবর্তন করা এবং তাদের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য এবং বৈধতা তুলে ধরতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ইসলামি চিন্তার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তার ধারা গড়ে তুলতে হবে। এর মাধ্যমে সমাজের আলোচনার ধারা পরিবর্তন করে ইসলামের প্রতি ইতিবাচক ধারণা তৈরি করা সম্ভব হবে।

সেক্যুলার-প্রগতিশীলদের সামাজিক হেজেমনি ভাঙ্গার অর্থ শুধু শিল্পসাহিত্য বা মিডিয়া অঙ্গনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নয়, বরং এর অর্থ হলো তাদের বেঁধে দেয়া চিন্তার সীমানাকে চ্যালেঞ্জ করা এবং সেই সীমানার বাইরে গিয়ে ইসলামী চিন্তাধারার ভিত্তিতে নতুন বয়ান তৈরি করা। এর জন্য প্রয়োজন, সঠিকভাবে কৌশল নির্ধারণ করা, সেক্যুলার-প্রগতিশীলদের সামাজিক বৈধতাকে আক্রমণ করা, এবং ইসলামের প্রকৃত চেতনাকে সামনে এনে সমাজের গ্রহণযোগ্য আলোচনার ধারা পরিবর্তন করা। এই পদ্ধতিই সেক্যুলার-প্রগতিশীলদের কালচারাল হেজেমনি ভাঙ্গার প্রকৃত উপায়।

Thanks For Comment we are reply soon as possible.

Previous Post Next Post