নৈতিকতার পরিবর্তন: লিবারেল-সেক্যুলার প্রগতিবাদ

সমাজের নৈতিক মানদণ্ডগুলি কীভাবে গড়ে ওঠে এবং তা কীভাবে পরিবর্তিত হয়, এটি দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের একটি বিষয়। বিশেষ করে লিবারেল-সেক্যুলার প্রগতিবাদীদের নৈতিকতা বিষয়ক ধারণাগুলি একটি বিশেষ মনোভাবের জন্ম দিয়েছে যেখানে সময়ের সাথে সাথে নৈতিকতার পরিবর্তনকে এক প্রাকৃতিক ও অবধারিত প্রক্রিয়া হিসেবে গণ্য করা হয়। এই প্রগতিশীল মতবাদে বিশ্বাসীরা মনে করে, সময়ের সাথে যে নৈতিকতা পরিবর্তিত হচ্ছে, তা মেনে নেয়া উচিত এবং ধর্মীয় নৈতিকতার প্রতি অনুগত থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। তবে, এই চিন্তাধারার মধ্যেই এক গভীর বিভ্রান্তি এবং অসংগতি বিদ্যমান।

প্রগতিশীল নৈতিকতার পরিচয় ও এর সমস্যা

লিবারেল-সেক্যুলার প্রগতিবাদীদের মতে, নৈতিকতার পরিবর্তন হলো একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। অতীতে যা অনৈতিক বলে বিবেচিত হতো, তা আজকের দিনে হয়তো নৈতিক বলে গণ্য হতে পারে। যেমন, অতীতে বিয়ে-বহির্ভূত যৌনতা (যিনা) ছিল অনৈতিক, কিন্তু আজ তা অধিকাংশ প্রগতিবাদীর চোখে স্বাভাবিক এবং গ্রহণযোগ্য। তারা যুক্তি দেয় যে, মানুষের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথে সাথে আমরা বুঝতে শিখছি কোনটি ক্ষতিকর এবং কোনটি ক্ষতিকর নয়। একে তারা ‘হার্ম প্রিন্সিপাল’ বলে পরিচিত করে, যার মূল বক্তব্য হলো, কোনো কাজ যদি অন্যের ক্ষতি না করে, তবে তা নৈতিকভাবে বৈধ।

তবে, এই নীতির মধ্যেই এক ধরনের অসংগতি এবং দুর্বলতা বিদ্যমান। যদি হার্ম প্রিন্সিপালকে সর্বজনীন নৈতিকতার মাপকাঠি হিসেবে গণ্য করা হয়, তবে এর পরিবর্তনশীলতা কি নৈতিকতার পরিবর্তনকেও প্রভাবিত করবে না? যদি নৈতিকতা পরিবর্তনশীল হয় এবং হার্ম প্রিন্সিপালই একমাত্র নৈতিকতার ভিত্তি হয়, তবে এক সময়ে হয়তো ক্ষতির ধারণাটিই পরিবর্তিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রগতিশীলদের যুক্তি ধ্বংস হয়ে যায়। যেমন, যদি একদিন শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদকে গ্রহণযোগ্য এবং নৈতিক বলে গণ্য করা হয়, তবে কি লিবারেল-সেক্যুলার প্রগতিবাদীরা তা মেনে নেবে? এ ধরনের একটি পরিবর্তন কি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে?

নৈতিকতার অপরিবর্তনীয়তা এবং মুসলিম দৃষ্টিভঙ্গি

মুসলিমদের নৈতিকতার ক্ষেত্রে একটি অপরিবর্তনীয় এবং পরম মানদণ্ডে বিশ্বাস রয়েছে, যা আল্লাহর ওহির মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। এই নৈতিকতার ভিত্তি হলো আল্লাহর আদেশ এবং নবীর (সা.) সুন্নাহ। এই বিশ্বাস অনুসারে, নৈতিকতার কোনো পরিবর্তন হতে পারে না, কারণ আল্লাহর আদেশ সবসময় সঠিক এবং সর্বদা প্রযোজ্য। তাই, মুসলিমদের নৈতিকতা পরিবর্তনশীলতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেয়।

লিবারেল-সেক্যুলার প্রগতিবাদীদের নৈতিক অগ্রগতির ধারণাটি মুসলিম দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য নয়। মুসলিমদের বিশ্বাস হলো, নৈতিকতার কোনো পরিবর্তন হয় না এবং কোনো প্রকার মানবসৃষ্ট পরিবর্তন তা পরিবর্তন করতে পারে না। আল্লাহর আদেশ সবসময়ই সঠিক এবং অপরিবর্তনীয়।

হার্ম প্রিন্সিপালের সমালোচনা

লিবারেল-সেক্যুলার প্রগতিবাদীদের হার্ম প্রিন্সিপাল নিয়ে যেসব আলোচনা রয়েছে, তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে একাধিক জ্ঞানতাত্ত্বিক সমস্যা দেখা দেয়। প্রথমত, ক্ষতির সংজ্ঞা কী এবং তা নির্ধারণ করবে কে? ক্ষতির ধারণা গড়ে ওঠে ব্যক্তির নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের ভিত্তিতে। তাই, কারো কাছে যা ক্ষতিকর মনে হতে পারে, তা অন্য কারো কাছে ক্ষতিকর নাও মনে হতে পারে। যেমন, কোনো সম্প্রদায়ের কাছে যিনা ক্ষতিকর এবং অনৈতিক মনে হতে পারে, অন্যদিকে, লিবারেল-সেক্যুলারদের কাছে তা ক্ষতিকর নাও মনে হতে পারে।

তাহলে, ক্ষতির সংজ্ঞা এবং এর ভিত্তি কীভাবে নির্ধারণ করা হবে? লিবারেল-সেক্যুলার প্রগতিবাদীদের এই প্রশ্নের কোনো জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি নেই, যা তাদের নৈতিক অগ্রগতির ধারণাকে টিকিয়ে রাখতে পারে। তারা মনে করে যে, সময়ের সাথে সাথে আমরা নতুন নতুন ক্ষতি আবিষ্কার করছি এবং এর ভিত্তিতে নৈতিকতার পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু এই ক্ষতি আবিষ্কারের প্রক্রিয়া কীভাবে ঘটে এবং এর ভিত্তি কী, তা তারা স্পষ্টভাবে বলতে সক্ষম নয়।

পরিবর্তনশীল নৈতিকতার অসংগতি

লিবারেল-সেক্যুলার প্রগতিবাদীদের মতে, সময়ের সাথে সাথে আমাদের নৈতিকতা উন্নত হচ্ছে এবং আমরা নতুন নতুন ক্ষতির উৎস খুঁজে পাচ্ছি। তবে, এই ধারণার মধ্যে এক ধরনের অসংগতি রয়েছে। প্রথমত, যে সব জিনিসকে তারা আজ ক্ষতিকর মনে করছে, তা ইতিহাসে সব সময়ই কি ক্ষতিকর বলে গণ্য করা হতো? উদাহরণস্বরূপ, সমকামিতাকে আজ ক্ষতিকর এবং অনৈতিক মনে করা হয় না, কিন্তু অতীতে তা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাহলে, ক্ষতি এবং নৈতিকতার ধারণা সময়ের সাথে পরিবর্তিত হচ্ছে, এবং তা নির্ধারণ করছে কারা?

দ্বিতীয়ত, যদি ক্ষতি সব সময়ই একই থাকে এবং তা একসময় দূর করার জন্য নৈতিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন হয়, তাহলে নৈতিক অগ্রগতি কোথায় হলো? লিবারেল-সেক্যুলার প্রগতিবাদীরা বলে থাকে, দুষ্ট লোকেরা নৈতিকতার পরিবর্তনের পথ আটকায় রেখেছিল, তাই অগ্রগতি হয়নি। কিন্তু এটি নৈতিক অগ্রগতির ধারণার বিরুদ্ধে যায়। কারণ, ক্ষতি যদি সব সময় একই থাকে, তবে তা পরিবর্তনশীল নয়, এবং নৈতিক অগ্রগতির কোনো স্থান নেই।

লিবারেল-সেক্যুলার প্রগতিবাদীদের নৈতিক অগ্রগতির ধারণা এক জ্ঞানতাত্ত্বিক অসংগতি এবং বিভ্রান্তির জন্ম দেয়। তাদের হার্ম প্রিন্সিপাল এবং পরিবর্তনশীল নৈতিকতার ধারণা যে বাস্তবতায় টিকে থাকে না, তা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই স্পষ্ট হয়ে যায়। মুসলিমদের জন্য এই ধরনের ধারণার বিরোধিতা করা এবং তাদের নৈতিকতার অপরিবর্তনীয়তা ও পরম মানদণ্ডকে তুলে ধরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের উচিত লিবারেল-সেক্যুলার প্রগতিবাদীদের এই কল্পকাহিনির ফাঁকফোকরগুলো উদঘাটন করা এবং তাদেরকে এই জ্ঞানতাত্ত্বিক দুর্বলতাগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করানো।


Thanks For Comment we are reply soon as possible.

Previous Post Next Post