পশ্চিমা বিশ্বের ইসলামবিদ্বেষ এবং মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব নতুন কিছু নয়। এই মনোভাবের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, যা উপনিবেশবাদী শাসনের সময় থেকে শুরু করে আজও অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু মুসলিমদের মধ্যে যখন এই হীনম্মন্যতা, আত্মঘৃণা এবং ইসলামকে সমস্যা হিসেবে দেখার মানসিকতা জন্ম নেয়, তখন তা আরও দুঃখজনক এবং গভীর সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এই ব্লগে আমরা এই বিষয়ে আলোচনা করবো, এবং বুঝতে চেষ্টা করবো কেন মুসলিমদের মধ্যে এই হীনম্মন্যতা সৃষ্টি হয়েছে এবং এর প্রভাব কীভাবে মুসলিম সমাজকে প্রভাবিত করছে।
ইসলামকে সমস্যা হিসেবে দেখা: একটি পরাজিত মানসিকতা
ইসলামকে সমস্যার মূল হিসেবে দেখা, বা ইসলামি সংস্কার এবং আধুনিকীকরণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা, অনেক মুসলিমের মধ্যে একটি পরাজিত মানসিকতার প্রতিফলন। এই মানসিকতা মূলত উপনিবেশবাদী শাসনের সময় থেকে শুরু হয়, যখন পশ্চিমা শক্তিগুলো তাদের শাসনকে টিকিয়ে রাখতে মুসলিমদের মন-মানসিকতাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিল। এই প্রভাব এতটাই গভীরে প্রবেশ করেছে যে আজও অনেক মুসলিম নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়কে সমস্যার মূল হিসেবে দেখে এবং ইসলাম থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে।
মর্ডানিস্ট মুসলিমদের ভূমিকা
মুসলিম সমাজে কিছু তথাকথিত মর্ডানিস্ট বা আধুনিকতাবাদী আলেম রয়েছেন, যারা ইসলামি আইন এবং শরিয়াহ নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তারা দাবি করেন যে পুরোনো ফিকহগুলোকে আবার খতিয়ে দেখা উচিত, নারীদের অধিকার নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা উচিত, এবং নতুন নতুন ইজতিহাদের প্রয়োজন রয়েছে। যদিও তাদের কিছু যুক্তি সময়ের দাবি হিসেবে দেখা যেতে পারে, তবে তাদের এই চিন্তাভাবনার পেছনে প্রায়ই থাকে ইসলামকে পশ্চিমা মানদণ্ডে সাজানোর প্রচেষ্টা।
ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব এবং মুসলিমদের হীনম্মন্যতা
ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ মুসলিমদের হীনম্মন্যতার মূল কারণগুলোর একটি। উপনিবেশিক শাসনের সময় মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, তারা পিছিয়ে পড়েছে কারণ তারা ইসলামকে আঁকড়ে ধরেছে। তাদের মনে করা হয়েছিল যে, ইসলামকে পরিত্যাগ না করলে তারা উন্নতি করতে পারবে না। এই চিন্তাভাবনা পরবর্তী প্রজন্মের মুসলিমদের মনেও গেঁথে গিয়েছিল, যা তাদের হীনম্মন্যতায় ভোগার অন্যতম কারণ।
ইসলামের দোষারোপ এবং পেছনে পড়ার আসল কারণ
ইসলামকে পেছনে পড়ার কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়, কিন্তু এই ধারণা কতটা সত্য? ভেনেজুয়েলা, ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো, এবং অন্যান্য অনেক অঞ্চলের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা ইসলাম মানে না, তবুও তারা অর্থনৈতিক দুর্দশায় ভুগছে। তাহলে তাদের পেছনে পড়ার কারণ কী? আসলে, পেছনে পড়ার আসল কারণ হলো অর্থনৈতিক অবরোধ, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির শোষণ, এবং পশ্চিমা দেশের স্বার্থে পরিচালিত সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র। ইসলামকে দায়ী করার মাধ্যমে এই আসল কারণগুলোকে ঢেকে দেওয়া হয়।
মিডিয়ার ভূমিকা এবং পশ্চিমা কূটকৌশল
পশ্চিমা মিডিয়া, বিশেষ করে নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো, এই কূটকৌশলের অংশ হিসেবে কাজ করে। তারা দারিদ্র্যপীড়িত দেশগুলোর দুর্দশাকে তুলে ধরে, কিন্তু কখনোই ওই দুর্দশার মূল কারণ হিসেবে পশ্চিমা দেশের আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধের কথা উল্লেখ করে না। এইভাবে তারা নিজেরাই নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করে, এবং মুসলিম দেশগুলোকে দোষারোপ করে তাদের পিছিয়ে পড়ার জন্য।
মুসলিমদের মধ্যে ইসলামকে সমস্যা হিসেবে দেখার যে মানসিকতা, তা মূলত উপনিবেশবাদী শক্তির প্রভাব এবং দীর্ঘদিনের হীনম্মন্যতার ফল। এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য মুসলিমদের নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং ইসলামের সোনালি যুগের আলেমদের ওপর ভরসা করতে হবে। ইসলাম কখনোই উন্নতির পথে বাধা নয়; বরং ইসলামি শিক্ষার সঠিক প্রয়োগ এবং আধুনিক সমস্যার সমাধানে ইসলামের মূলনীতির প্রয়োগই হতে পারে আমাদের উন্নতির চাবিকাঠি। তাই, নিজেদের ধর্মীয় পরিচয়কে সম্মান করা এবং ইসলামের প্রকৃত মর্মার্থকে বুঝে চলা আমাদের জন্য অপরিহার্য।