মৌলবাদ নেপত্যের গল্প

হলুদ মিডিয়ার কল্যাণে মৌলবাদ ট্যাগ শুধুমাত্র মুসলমানদের জন্য প্রযোজ্য এরকম একটি ধারণা আমাদের সাব্সকনসেন্স মাইন্ডে প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আমরা অনেকেই জানিনা মৌলবাদ শব্দটি কোথা থেকে উৎপন্ন হয়েছে। কেনই শুধু জঙ্গিবাদ দমনের নামে মুসলমানদেরকে অন্যায় ভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হয়, বলির পাঁঠা হতে হয় নিরীহ মুসলমানদের। সাধারণ মানুষের মনে এ ধরনের ধারণা স্থাপন করা হয়েছে যে, মৌলবাদ মানেই মুসলিম সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মৌলবাদ একটি নির্দিষ্ট ধর্ম বা সম্প্রদায়ের প্রতি সীমাবদ্ধ নয়। মৌলবাদ শব্দটি কোথা থেকে এসেছে এবং কেনই বা মুসলমানদের জন্য এটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য করা হয়েছে, তা নিয়ে ভাবা প্রয়োজন।

মৌলবাদ শব্দটি মূলত 'ফান্ডামেন্টালিজম' থেকে এসেছে, যা মূল বা মৌলিক বিষয়বস্তুকে বিশ্বাস ও পালন করার একটি কট্টর মনোভাবকে বোঝায়। কোনো ব্যক্তির যদি তার ধর্ম, জাতীয়তা বা মতবাদে দৃঢ় বিশ্বাস থাকে এবং সে সেই বিশ্বাসকে পূর্ণভাবে মেনে চলে, তবে তাকে মৌলবাদী বলা যায়। কিন্তু বর্তমান সমাজে এই শব্দটি মুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে বিশেষভাবে যুক্ত করা হয়েছে, যা মৌলিকভাবে পক্ষপাতমূলক এবং অন্যায়।

অমুসলিম তো আছেই - মুসলিমরাও এই মৌলবাদী কথাটির অর্থ বোঝে না। বড় দাড়ি ও টুপিওয়ালা হুজুরকে বলে মৌলবাদী এটা একটা ভ্রান্ত ধারণা। এভাবে তারা আসলে সন্ত্রাসীকে আড়াল করে আর হুজুরদের অপমান করে। অবশেষে, আসল মৌলবাদী অজানা থেকে যায়। মৌলবাদ মূলত কোন কিছুর মূল বিষয়বস্তুকে গ্রহণ করা, বলা যেতে পারে কট্টর ভাবে মৌলিক বিষয়বস্তু মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা এবং তা গ্রহণ করা। একটা জিনিস লক্ষ্য করেন বর্তমানে শুধুমাত্র মৌলবাদ শব্দটি মুসলমানদের জন্য প্রযোজ্য এ যেনো মুসলমানদের ঘায়েল করার একটি সূক্ষ্ম হাতিয়ার।

এখানে প্রশ্ন উঠে, কেন কেবল মুসলমানদেরকেই মৌলবাদী বলে আখ্যায়িত করা হয়? কেন কোনো হিন্দু, খ্রিস্টান, বা নাস্তিক মৌলবাদী বলে পরিচিত হয় না? এর উত্তর হলো, আমাদের মানসিকতায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে একটি সুক্ষ্ম প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে, যা মৌলবাদের সংজ্ঞাকে বিকৃত করে তুলেছে। মুসলমানদের জন্য মৌলবাদ শব্দটির প্রয়োগ আসলে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার, যার মাধ্যমে তাদের নিপীড়ন ও অপমান করা হয়।

মৌলবাদী কারা: বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

মৌলবাদ শুধু ইসলামিক পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি অন্যান্য ধর্ম ও মতবাদেও প্রচুর দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, একজন হিন্দু যদি তার ধর্মীয় রীতিনীতি ও বিশ্বাস কট্টরভাবে মেনে চলে, তবে সে হিন্দু মৌলবাদী। একইভাবে, একজন জাতীয়তাবাদী যদি তার জাতীয়তার প্রতি অন্ধবিশ্বাসী হয় এবং সেই বিশ্বাসকে সকলের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে সে জাতীয়তাবাদী মৌলবাদী।

কিন্তু দেখা যায়, অন্য কোনো ধর্মের বা মতবাদের প্রতি এই শব্দটি খুব কমই প্রয়োগ করা হয়। নাস্তিক্যবাদের কট্টরপন্থিরা মৌলবাদী বলে পরিচিত হয় না, কারণ তারা একটি প্রচারণার মাধ্যমে আমাদের মানসিকতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে যে মৌলবাদ মানেই মুসলমান। এই মানসিকতা কেবল মুসলমানদের হেয় করার জন্যই গঠিত হয়েছে এবং এটি একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের ফল।

মৌলবাদ ও মিডিয়ার ভূমিকা

মিডিয়া মৌলবাদের প্রকৃত সংজ্ঞা থেকে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। হলুদ সাংবাদিকতার মাধ্যমে মুসলমানদের প্রতি যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা হয়েছে, তা সমাজে এক ধরনের অবিচার ও বৈষম্যের জন্ম দিয়েছে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে মৌলবাদী আখ্যা দিয়ে তাদের প্রতি অযথা ভয়, সন্দেহ ও অবিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। এর ফলে, নিরীহ মুসলমানরা অপমানিত হয় এবং তাদের মৌলিক অধিকার হরণ করা হয়।

মিডিয়ার এই প্রচারণা শুধুমাত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয় না; এটি তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে হুমকির মুখে ফেলেছে। মুসলমানদের বিরুদ্ধে এমন প্রোপাগান্ডা একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক ষড়যন্ত্রের অংশ, যার মাধ্যমে ইসলামকে দুর্বল করে তোলা হচ্ছে। কিন্তু মুসলমানদের উচিত এই ধরনের ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করা এবং তাদের নিজেদের সঠিক পরিচয় ও বিশ্বাস রক্ষায় দৃঢ় থাকা।

মৌলবাদ ও আধুনিক সমাজ: একটি নতুন ভাবনা

মৌলবাদ নিয়ে আমাদের সমাজে প্রচলিত চিন্তাভাবনাকে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। মৌলবাদ শব্দটির যথাযথ ব্যবহার না হলে এটি কেবল মুসলমানদের উপর নির্যাতনের একটি হাতিয়ার হয়ে থাকবে। আমাদের উচিত মৌলবাদের প্রকৃত সংজ্ঞা বোঝা এবং তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা, যাতে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্য না ঘটে।

মৌলবাদ যে কোনো ধর্ম, জাতীয়তা বা মতবাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতে পারে, যদি সেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তাদের বিশ্বাস ও মতবাদকে কট্টরভাবে পালন করে এবং অন্যদের উপর তা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু কেবলমাত্র মুসলমানদের মৌলবাদী বলে আখ্যায়িত করা এক ধরনের ভ্রান্ত ধারণা, যা থেকে আমাদের মুক্তি পেতে হবে।

আমাদের উচিত মৌলবাদ শব্দটির একটি সঠিক ও নিরপেক্ষ সংজ্ঞা প্রতিষ্ঠা করা, যা সকল ধর্ম, জাতীয়তা ও মতবাদের প্রতি সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। মৌলবাদী ব্যক্তি যে কোনো ধর্মের হতে পারে, এবং এটি কেবলমাত্র মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি সীমাবদ্ধ নয়। এই সচেতনতা আমাদের সমাজে মুসলমানদের প্রতি বৈষম্য ও অত্যাচারের অবসান ঘটাতে সহায়ক হবে।

মৌলবাদ প্রয়োজনীয়তা

মৌলবাদ নিয়ে যে ভ্রান্ত ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা থেকে মুক্তি পাওয়ার সময় এসেছে। মুসলমানদের প্রতি মৌলবাদী তকমা দেওয়া বন্ধ করে, আমাদের উচিত মৌলবাদ শব্দটির প্রকৃত অর্থ ও ব্যবহারকে সঠিকভাবে বুঝা। মৌলবাদ কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা সম্প্রদায়ের বিষয় নয়; এটি একটি বিশ্বাসের প্রতি গভীর অনুরাগ ও প্রতিশ্রুতির বহিঃপ্রকাশ। এখন সময় এসেছে এই শব্দটির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা, যাতে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের উপর অন্যায় অত্যাচার না ঘটে। আমাদের উচিত মৌলবাদ নিয়ে নতুনভাবে ভাবা, যাতে সমাজে ন্যায়বিচার ও সমতার পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।


Thanks For Comment we are reply soon as possible.

Previous Post Next Post