ফ্যাসিজমের মূল বৈশিষ্ট্য ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

 ফ্যাসিজম

ফ্যাসিজম একটি রাজনৈতিক মতবাদ যা ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত এবং ক্ষতিকর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ফেলেছে। এটি এমন এক শাসনব্যবস্থা, যেখানে একজন একনায়ক এবং তার দল গণতন্ত্রের বিপরীতে শক্তি প্রয়োগ করে ক্ষমতা ধরে রাখে এবং জনগণের স্বাধীনতাকে হরণ করে। ইসলামে এই ধরনের শাসনব্যবস্থার বিরোধিতা করা হয়েছে এবং ইসলামী সমাজে ফ্যাসিজমের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে।

ফ্যাসিজমের মূল বৈশিষ্ট্য ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

ফ্যাসিজমের মূল বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো কর্তৃত্ববাদী শাসন, জাতীয়তাবাদী উগ্রতা, ব্যক্তিস্বাধীনতার অভাব, এবং সমাজের ওপর নিপীড়নমূলক নিয়ন্ত্রণ। ইসলামে শাসক ও শাসিতের মধ্যে ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা এবং সমতা প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কুরআনে আল্লাহ বলেন,

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়বিচার কায়েম কর এবং কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে অবিচার করতে না প্ররোচিত করে। তোমরা ন্যায়পরায়ণ হও, কারণ তা হচ্ছে আল্লাহভীতির নিকটতম।" (সূরা আল-মায়েদা, ৫:৮)

ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থায় শাসকগণ জনগণের প্রতি দমনমূলক নীতি প্রয়োগ করে এবং কোনো প্রকার সমালোচনা বা বিরোধিতা সহ্য করেন না। ইসলামে এই ধরনের দমনমূলক শাসন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

"সর্বোত্তম জিহাদ হলো অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য কথা বলা।" (তিরমিজি)

মানবাধিকার ও ফ্যাসিজম: ইসলামের দৃষ্টিতে

ফ্যাসিজমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং জনগণের ওপর নির্যাতন চালানো। ফ্যাসিস্ট শাসনে ব্যক্তির অধিকার হরণ করা হয় এবং শাসকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার বিরোধিতা বা মতপ্রকাশ করা কঠোরভাবে দমন করা হয়। ইসলামে মানবাধিকার একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। ইসলাম সব মানুষের প্রতি সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শনের নির্দেশ দেয় এবং কারো ওপর জুলুম করার কঠোরভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

"আমি আদম সন্তানকে সম্মানিত করেছি।" (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৭০)

ফ্যাসিজমের শাসনব্যবস্থায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ফলে সমাজে অস্থিরতা এবং বিদ্রোহের জন্ম নেয়, যা ইসলামের নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।

ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে ইসলামি প্রতিরোধ

ইসলামে ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের জন্য মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ থাকার এবং ন্যায়ের পথে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফ্যাসিস্ট শাসনে যে অন্যায় ও অত্যাচার চালানো হয়, তার বিরুদ্ধে মুসলমানদের প্রতিবাদ করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো একটি ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ইসলামে বলা হয়েছে,

"তোমরা ভালো কাজের আদেশ দাও এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ করো।" (সূরা আলে-ইমরান, ৩:১১০)

ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এই নীতির ওপর ভিত্তি করে ইসলামে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের গুরুত্ব অনেক বেশি।

ফ্যাসিজম ও ইসলামে সামাজিক ন্যায়বিচার

ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থা সাধারণত সামাজিক ন্যায়বিচারের বিপরীতে অবস্থান করে এবং ক্ষমতাকে একটি কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ রাখে। এর ফলে সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধি পায় এবং সমাজের দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অবহেলিত হয়। ইসলামে সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কুরআনে আল্লাহ বলেন,

"নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়ের নির্দেশ দেন এবং অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকে নিষেধ করেন।" (সূরা নাহল, ১৬:৯০)

ফ্যাসিজমের শাসনব্যবস্থায় এই নীতির অবহেলা করা হয়, যা ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী।

ফ্যাসিস্ট শাসনে ধর্মের অপব্যবহার ও ইসলামের শিক্ষণ

ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থায় ধর্মকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য ধর্মীয় বিষয়াবলীকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা হয়। ইসলামে ধর্মের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কতা দেওয়া হয়েছে। ইসলামে ধর্মকে কোনো প্রকার রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য ব্যবহার করা নাজায়েজ বলে গণ্য করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,

"যে ব্যক্তি আমাদের ধর্মকে ব্যবহার করে দুনিয়ার লাভবান হয়, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।" (আবু দাউদ)

ইসলামের আলোকে ফ্যাসিজমের বিপজ্জনক প্রভাব

ফ্যাসিজমের প্রভাবে সমাজে বিভাজন সৃষ্টি হয় এবং ক্ষমতাসীনদের স্বার্থে জনসাধারণকে ব্যবহার করা হয়। ইসলামে এই ধরনের শাসনব্যবস্থা সমাজের স্থিতিশীলতা ও শান্তির জন্য হুমকি বলে গণ্য করা হয়েছে। ইসলামে সমাজের মধ্যে একতা ও সহমর্মিতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছে,

"তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধর এবং বিচ্ছিন্ন হয়ো না।" (সূরা আলে-ইমরান, ৩:১০৩)

ফ্যাসিজমের শাসনব্যবস্থায় এই নীতির বিপরীতে জনগণকে বিভক্ত করা হয় এবং সমাজে বিভাজনের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখা হয়।

ফ্যাসিজম এমন এক শাসনব্যবস্থা যা ইসলামের নীতিমালার সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি মানুষের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকারকে হরণ করে এবং সমাজে বিভাজন ও অন্যায়ের জন্ম দেয়। ইসলামের দৃষ্টিতে ফ্যাসিজম একটি ক্ষতিকর ও ধ্বংসাত্মক মতবাদ, যা সমাজের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। ইসলামে শাসকদের প্রতি ন্যায়ের পথে চলার এবং জনগণের প্রতি সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা ফ্যাসিস্ট শাসনের সম্পূর্ণ বিপরীত। তাই ইসলামে ফ্যাসিজমের মতো শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।


Thanks For Comment we are reply soon as possible.

Previous Post Next Post