বিউটিফুল ইসলাম পর্ব: 19 ডিপ্রেশন বা হতাশাগ্রস্ত জীবন

মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা, সাফল্য ও ব্যর্থতা স্বাভাবিক বিষয়। তবে হতাশা এমন একটি মানসিক অবস্থা, যা মানুষকে ক্রমশ অন্ধকারে নিয়ে যায়। ইসলামে হতাশা একটি অমুমিনের গুণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোরআন ও হাদিসে হতাশা থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ নির্দেশিত হয়েছে। মুমিনের জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো বিশ্বাস, আশা ও ভালোবাসা, যা তাকে হতাশার অতল গহ্বর থেকে মুক্ত করে।

হতাশার কারণ ও এর প্রতিক্রিয়া

মানুষ সাধারণত প্রাপ্তিতে তৃপ্ত এবং অপ্রাপ্তিতে অতৃপ্ত হয়। তাৎক্ষণিক লাভ-ক্ষতিকে জীবনের সফলতা বা ব্যর্থতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করার ফলে হতাশা আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"আমি যখন মানুষকে নিয়ামত দান করি, তখন সে মুখ ফিরিয়ে নেয় ও পাশ কাটিয়ে যায়। আর যদি কোনো অনিষ্ট তাকে স্পর্শ করে, তখন সে হতাশ হয়ে পড়ে।" (সুরা ইসরা: ৮৩)

তবে মুমিন কখনো এই ক্ষণস্থায়ী কষ্টে বিভ্রান্ত হয় না। তিনি জানেন, এই দুনিয়া চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; বরং এটি পরকালের প্রস্তুতির একটি ধাপমাত্র।

হতাশা থেকে মুক্তির পথ: কোরআনের নির্দেশনা

কোরআন মাজিদে বারবার আল্লাহ তাআলা মানুষকে হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন:

"হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন।" (সুরা জুমার: ৫৩)

মুমিনের জীবনে হতাশার কোনো স্থান নেই। তিনি সবসময় আল্লাহর ওপর ভরসা করে ধৈর্য ধারণ করেন।

"ধৈর্যের সঙ্গে, নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য কামনা করো। অবশ্য তা কঠিন; শুধু বিনয়ী লোকদের পক্ষেই তা সম্ভব।" (সুরা বাকারা: ৪৫)

আশার অনুপ্রেরণা: নবীদের উদাহরণ

ইসলামের ইতিহাসে নবীদের জীবন আমাদের জন্য চিরকালীন অনুপ্রেরণা। হজরত ইয়াকুব (আ.) তার দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরও আশাবাদী ছিলেন। তিনি তার সন্তানদের বলেছিলেন:

"তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চিত জেনো, আল্লাহর রহমত থেকে অবিশ্বাসীরা ছাড়া কেউ নিরাশ হয় না।" (সুরা ইউসুফ: ৮৭)

দুঃখের পরে সুখ: আল্লাহর প্রতিশ্রুতি

আল্লাহ তাআলা বলেন:

"কষ্টের সঙ্গেই তো স্বস্তি আছে, অবশ্যই কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি রয়েছে।" (সুরা ইনশিরাহ: ৫-৬)

মুফাসসিররা বলেছেন, একটি কষ্টের দুই পাশে দুটি সুখ বিদ্যমান। তাই সাময়িক কষ্ট মুমিনকে কখনো হতাশ করতে পারে না।

আল্লাহর স্মরণে মানসিক প্রশান্তি

মানসিক চাপ দূর করার অন্যতম প্রধান উপায় হলো আল্লাহর স্মরণ।

"যারা বিশ্বাস করে এবং তাদের অন্তরগুলো আল্লাহর জিকির দ্বারা প্রশান্তি লাভ করে, জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্তি পায়।" (সুরা রাআদ: ২৮)

কুরআন তেলাওয়াত, নামাজ, এবং দোয়ার মাধ্যমে মুমিন তার হৃদয়ের প্রশান্তি খুঁজে পান। রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের জন্য বিশেষ একটি দোয়া শিখিয়েছেন, যা মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দেয়:

"হে আল্লাহ! আমি দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, ঋণের ভার ও লোকজনের প্রাধান্য থেকে আপনার কাছে পানাহ চাচ্ছি।" (সহিহ বোখারি: ২৮৯৩)

তাকদিরের ওপর বিশ্বাস

মুমিন জানেন, সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছায় ঘটে। তিনি বলেন:

"আল্লাহ যদি তোমাদের কষ্ট দেন, তিনি ছাড়া অন্য কেউ তা মোচন করতে পারে না। আর আল্লাহ যদি তোমাদের মঙ্গল চান, তাহলে তার অনুগ্রহ পরিবর্তন করারও কেউ নেই।" (সুরা ইউনুস: ১০৭)

এই বিশ্বাস মুমিনকে সবসময় ধৈর্যশীল ও আশাবাদী রাখে।

ডিপ্রেশন বা হতাশা থেকে মুক্তি পেতে আমাদের আল্লাহর দিকে ফিরে যেতে হবে। কুরআন ও হাদিসে প্রদত্ত নির্দেশনা মেনে চললে এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখলে আমরা হতাশার চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারব। জীবনকে সফল করতে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে। কারণ তিনি বলেন:

"তোমরা আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেব।" (সুরা মুমিন: ৬০)

মুমিনের জন্য হতাশার কোনো স্থান নেই। বিশ্বাস, আশা ও ভালোবাসার শক্তি দিয়ে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আলোকিত হোক, এটাই আমাদের কামনা।

Thanks For Comment we are reply soon as possible.

Previous Post Next Post