মানবজীবনে শান্তি, মুক্তি এবং স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন আল্লাহর নির্ধারিত বিধান অনুসরণ করা। এই বিধান মানুষকে শুধু আত্মিক শান্তি দেয় না, বরং সমাজে কল্যাণ প্রতিষ্ঠায়ও ভূমিকা রাখে। ইমান অর্থ বিশ্বাস এবং নিরাপত্তা, যা মানুষের অন্তরে স্থিরতা আনে এবং সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু মাদকাসক্তি এমন একটি বিপর্যয়, যা শুধু ব্যক্তির জীবনে নয়, পুরো সমাজের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে।
মাদক: অপরাধের মূল উৎস
ইসলামে মাদক সেবন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। মাদক মানুষের মানসিক এবং শারীরিক স্বাভাবিকতাকে ধ্বংস করে দেয়। এটি শুধু ব্যক্তির বিবেক ও বুদ্ধিকে দুর্বল করে না, বরং তাকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দিকে ধাবিত করে। ইসলামে যে সব পাপ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তার মধ্যে মাদক এমন একটি অপরাধ যা ব্যক্তির নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। মাদকাসক্ত ব্যক্তি ইচ্ছা করলেও সহজে নেশা ছাড়তে পারে না।
মাদক হলো অপরাধের মূল উৎস। কোরআনে বর্ণিত হারুত ও মারুতের কাহিনিতে আমরা দেখতে পাই, কীভাবে মাদকের প্রভাবে তারা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। (সুরা বাকারা, আয়াত ১০২)।
মাদক নিষিদ্ধকরণের উদ্দেশ্য
ইসলামে শরিয়তের মূল উদ্দেশ্য হলো পাঁচটি:
১. জীবন রক্ষা
২. সম্পদ রক্ষা
৩. জ্ঞান রক্ষা
৪. বংশ রক্ষা
৫. ধর্ম রক্ষা
মাদক সেবন জ্ঞান-বুদ্ধি নষ্ট করে এবং এই পাঁচটি লক্ষ্যকেই বাধাগ্রস্ত করে। তাই ইসলামে মাদক হারাম।
কোরআনের নির্দেশনা
মাদক নিষিদ্ধকরণের বিষয়ে কোরআনে তিনটি ধাপে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে:
১. প্রথমে বলা হয়েছে, এতে পাপ ও ক্ষতি বেশি, যদিও কিছু উপকার থাকতে পারে (সুরা বাকারা, আয়াত ২১৯)।
২. পরে একে শয়তানের কাজ বলে ঘোষণা করা হয়েছে এবং সফল হতে চাইলে তা বর্জনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (সুরা মায়েদা, আয়াত ৯০)।
৩. সর্বশেষে বলা হয়েছে, মদ ও জুয়া আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে রাখে এবং শত্রুতা সৃষ্টি করে। (সুরা মায়েদা, আয়াত ৯১)।
মাদকের ভয়াবহতা ও ইসলামের কঠোর অবস্থান
ইসলামে মাদক হারাম হওয়ার পাশাপাশি এটি অপবিত্র। মাদক সেবন যেমন নিষিদ্ধ, তেমনই মাদক সংগ্রহ, সংরক্ষণ, বিতরণ এবং বিক্রয়ও সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। রাসুল (সা.) বলেন, “প্রত্যেক নেশাজাতীয় বস্তু হারাম।” (বুখারি, হাদিস ৪৩৪৩)।
মাদকাসক্তির ফলাফল
১. স্বাস্থ্যগত ক্ষতি: মাদক শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতাকে ধ্বংস করে। তামাক ও মাদক থেকে ক্যান্সার, লিভারের ক্ষতি, হার্ট অ্যাটাকসহ নানা রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
২. পারিবারিক ভাঙন: মাদকাসক্তি পারিবারিক বন্ধন দুর্বল করে এবং অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে।
৩. সামাজিক অপরাধ: মাদকের কারণে চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ এবং হত্যার মতো অপরাধ বাড়ে।
৪. আত্মিক অবক্ষয়: মাদকাসক্ত ব্যক্তি আল্লাহর ইবাদত থেকে দূরে সরে যায় এবং আত্মিক উন্নতি ব্যাহত হয়।
মাদক প্রতিরোধে করণীয়
মাদক প্রতিরোধে ইসলামি নির্দেশনার পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা প্রয়োজন।
- পারিবারিক ভূমিকা: সন্তানদের ভালোভাবে মানুষ করার জন্য পরিবারের সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
- শিক্ষার প্রসার: ইসলামের শিক্ষা ছড়িয়ে দিয়ে মানুষকে সচেতন করা জরুরি।
- সামাজিক আন্দোলন: মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং মাদকবিরোধী কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে হবে।
ইসলামের সমাধান
ইসলামে মাদক পরিহারের জন্য ইমান ও আমলের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা নিজেদের ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না।” (সুরা বাকারাহ, আয়াত ১৯৫)। রাসুল (সা.) বলেছেন, “যা বেশি সেবনে নেশা হয়, তার সামান্য পরিমাণও হারাম।” (তিরমিজি, হাদিস ১৮৬৫)।
মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের জন্য আমাদের প্রতিটি স্তরে কাজ করতে হবে। ইসলামি শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী মাদককে পরিহার করে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। আল্লাহ আমাদের এই বিপদ থেকে রক্ষা করুন এবং সৎ পথে চলার তৌফিক দিন।