ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে, হক ও বাতিলের সংঘাত চিরন্তন বাস্তবতা হিসেবে উপস্থিত। এর মাঝে রয়েছে একটি শ্রেণি যারা নিজেদের "সাইলেন্ট মেজরিটি" হিসেবে গুটিয়ে রাখে। তারা সরাসরি কোনো পক্ষ নেয় না, তবে সঠিক ভূমিকা পালনে পিছিয়ে থাকে। সমাজের এই নিরপেক্ষতার মনোভাব শুধু একটি মৌলিক সমস্যাই নয়, বরং এর ফলে সমাজের হকপন্থীদের দুর্বল করে দেয়। এ লেখায় আমরা বাংলাদেশে ইসলাম ও মুসলিমদের বর্তমান অবস্থান, সেক্যুলার শ্রেণির আধিপত্য, এবং সাইলেন্ট মেজরিটির ভূমিকাকে বিশ্লেষণ করব। পাশাপাশি করণীয় ও সমাধানের পথ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হবে।
সাইলেন্ট মেজরিটি: নিরপেক্ষ নাকি পালিয়ে থাকা?
সাইলেন্ট মেজরিটি মূলত এমন একটি শ্রেণি, যারা জীবনের খুঁটিনাটি সমস্যায় এতটাই ব্যস্ত যে বৃহৎ সামাজিক ও আদর্শিক সংঘাতে অংশগ্রহণ করতে চায় না। তবে ইতিহাস সাক্ষী, এই শ্রেণির নিরবতা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাতিল শক্তিরই জয় নিশ্চিত করে।
উদাহরণ:
কুরআনে বর্ণিত বনি ইসরাইলের ঘটনায় তিনটি শ্রেণি স্পষ্টভাবে উঠে আসে:
যারা সৎ কাজের আদেশ দেয় ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।
যারা নিরব থাকে, নিজেদেরকে নিরাপদ খোলসের মধ্যে রাখে।
আল্লাহর শাস্তি যখন আসে, তখন কেবল দ্বিতীয় দল নাজাত পেয়েছিল। এই ঘটনা আমাদের জন্য এক চরম শিক্ষা যে নিরপেক্ষতা আদতে সঠিক অবস্থান নয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: সেক্যুলার শ্রেণির আধিপত্য
বাংলাদেশের মুসলিম সমাজ ও ইসলামকে ঘিরে সেক্যুলার শ্রেণি যে আধিপত্য কায়েম করেছে, তা একদম সুস্পষ্ট। এর মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রীয় কাঠামো, শিক্ষা, সংস্কৃতি, এবং মিডিয়ার ওপর এমন একটি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, যার ফলে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
সেক্যুলার শ্রেণির বৈশিষ্ট্য:
ইসলামবিরোধী মনোভাব:ইসলামের এমন দিকগুলোকে যা সামাজিক এবং রাজনৈতিক শক্তি দিতে পারে, তা দমন করা হয়।
মিডিয়া ও সংস্কৃতির অপপ্রয়োগ:
ইসলামের বিপক্ষে জনমত তৈরিতে মিডিয়া ব্যবহৃত হয়।
আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য:
ইসলামী চেতনা প্রকাশ কিংবা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন অত্যন্ত কঠিন।
ইসলামপন্থীদের চ্যালেঞ্জ:
ইসলামের প্যারাডাইমে রাজনীতির কথা বলা মানেই "উগ্রবাদী" ট্যাগ পাওয়া।সেক্যুলার কাঠামোর বাইরে গিয়ে চিন্তা করার সুযোগ প্রায় নেই।
ইসলামী আন্দোলনগুলো বড় দলের জুনিয়র পার্টনার হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকে।
সাইলেন্ট মেজরিটির ভূমিকা
সাইলেন্ট মেজরিটি সাধারণত সেক্যুলার আধিপত্যকে মেনে নেয়। যদিও তাদের মধ্যে ইসলামের প্রতি কিছুটা সহানুভূতি রয়েছে, তবে দ্বীনের সঠিক বুঝের অভাব এবং সামাজিক চাপ তাদের কার্যত নিরপেক্ষ করে দেয়। এই শ্রেণিকে নিয়ে কাজ করা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করলে সমাজের গঠনমূলক পরিবর্তন সম্ভব।
করণীয়: সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ
বাংলাদেশে ইসলামের স্বাভাবিকীকরণ এবং সেক্যুলার আধিপত্য ভাঙতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:
১. সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি
ইসলামের পোশাক, আদর্শ, এবং চেতনার প্রতি জনসাধারণের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি করা।মিডিয়া ও সংস্কৃতির ইতিবাচক ব্যবহার করে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা প্রচার।
২. সেক্যুলার শ্রেণির ক্ষমতা দুর্বল করা
"উগ্রবাদ" ট্যাগ দিয়ে ইসলামকে কোণঠাসা করার ক্ষমতা থেকে সেক্যুলার শ্রেণিকে বিচ্ছিন্ন করা।সেক্যুলারদের প্রতিষ্ঠিত বয়ান চ্যালেঞ্জ করে ইসলামের ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তুলে ধরা।
৩. ইসলামের রাজনৈতিক পরিচিতি প্রতিষ্ঠা
ইসলামের প্যারাডাইমে রাজনীতির কথা বলার সুযোগ তৈরি করা।একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা।
৪. শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠন
সেক্যুলার প্রভাবমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশ।ইসলামের ইতিহাস, বিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্বের বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা।
৫. সাইলেন্ট মেজরিটিকে সক্রিয় করা
এই শ্রেণিকে ইসলামের প্রতি সচেতন করে তোলা।তাদের মধ্যে আত্মজিজ্ঞাসা এবং আদর্শিক চিন্তার বিকাশ ঘটানো।
৬. ইসলামবিরোধী প্রচারণার মোকাবিলা
মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসলামকে কেন্দ্র করে চলমান প্রোপাগান্ডার জবাব দেওয়া।গবেষণা ও যুক্তির মাধ্যমে ইসলামকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন।
চূড়ান্ত ভাবনা
হক-বাতিলের সংঘাতে নিরপেক্ষ থাকার সুযোগ নেই। বনী ইসরাইলের ঘটনা থেকে আমরা যে শিক্ষা পাই তা হলো, নিরপেক্ষতা ধ্বংসের কারণ। বাংলাদেশে সেক্যুলার শ্রেণির আধিপত্য ভাঙতে হলে আদর্শিক মুসলিমদের একটি সুসংগঠিত, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। সমাজের সাইলেন্ট মেজরিটিকে ইসলামি চেতনায় অনুপ্রাণিত করে আন্দোলনের অংশীদার করা যেতে পারে।
সমস্যা জটিল হলেও এর সমাধান সম্ভব। ইসলামিক চেতনা ও কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি ন্যায়পরায়ণ, ভারসাম্যপূর্ণ এবং আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা আমাদের প্রতিজ্ঞা হওয়া উচিত।