বহু বছর ধরে আমরা "নিরপেক্ষতা" শব্দটি একটি আদর্শিক মান হিসেবে দেখে এসেছি। মনে করা হয়, একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি কোনো পক্ষপাতিত্ব করেন না এবং প্রত্যেকের প্রতি সমান আচরণ করেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ন্যায়বিচার কি নিরপেক্ষতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ? নাকি ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোই প্রকৃত মানবিকতার পরিচায়ক?
নিরপেক্ষতা: একটি ভ্রান্ত ধারণা
নিরপেক্ষতার ধারণাটি অনেক ক্ষেত্রেই বিভ্রান্তিকর। এটি আমাদের এমন এক অবস্থানে নিয়ে যায়, যেখানে সত্য-মিথ্যার বিভেদ লুপ্ত হয়ে যায়। নিরপেক্ষতা দাবি করে যে, "আমি কারও পক্ষে বা বিপক্ষে নই," অথচ ন্যায়ের পক্ষে থাকা মানে সত্যের পক্ষে থাকা।
ধরা যাক, একটি পক্ষ শোষণের শিকার এবং অন্য পক্ষ শোষক। নিরপেক্ষতা বলবে, "আমি কারও পক্ষ নেব না," অথচ ন্যায় বলবে, "আমি শোষিতের পক্ষে দাঁড়াবো।" তাই নিরপেক্ষতা আসলে অন্যায়কে পরোক্ষভাবে সমর্থন করে।
ন্যায়: নিরপেক্ষতার চেয়েও বড়
ন্যায় হচ্ছে একমাত্র নীতি যা সত্য ও মিথ্যার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করে। কোরআনে আল্লাহ বলেন:
“হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক এবং আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য প্রদান কর, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বা তোমাদের পিতা-মাতা বা আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়।”(সূরা নিসা: ১৩৫)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলাম নিরপেক্ষতার দিকে আহ্বান জানায় না। বরং ইসলাম ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলস পরিশ্রমের নির্দেশ দেয়, যা নিরপেক্ষতার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর এবং গুরুত্বপূর্ণ।
নিরপেক্ষতার নামে অন্যায়ের প্রশ্রয়
আজকের বিশ্বে নিরপেক্ষতার ধারণা ব্যবহার করা হয় অন্যায়কে লুকানোর জন্য। আমরা আন্তর্জাতিক রাজনীতি, সামাজিক সমস্যা, এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্কেও এই প্রবণতা দেখতে পাই।
উদাহরণ ১: আন্তর্জাতিক রাজনীতি
অনেক রাষ্ট্র নিরপেক্ষ থাকার নাম করে অন্যায় দমন করার কোনো পদক্ষেপ নেয় না। ফিলিস্তিনের নির্যাতিত জনগণ যখন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন অনেক রাষ্ট্র "নিরপেক্ষতা"র অজুহাতে চুপ থাকে।
উদাহরণ ২: সামাজিক ইস্যু
কোনো একটি সমাজে দুর্বলদের ওপর যখন অত্যাচার হয়, তখন নিরপেক্ষ ব্যক্তিরা বলে, "আমি এর মধ্যে পড়তে চাই না।" কিন্তু এই নিরপেক্ষ অবস্থান তাদের অন্যায়ের সহযোগী বানিয়ে দেয়।
ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের করণীয়
১. সত্য-মিথ্যা যাচাই করুন
প্রতিটি পরিস্থিতিতে সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার পার্থক্য নির্ণয় করা আমাদের দায়িত্ব। কেবল নিরপেক্ষ থাকার অজুহাতে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।
২. অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিন
নিরপেক্ষ না থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। এটি ছোট পদক্ষেপ হতে পারে, যেমন অন্যায়ের প্রতিবাদ করা বা কারও অধিকার রক্ষায় অংশগ্রহণ করা।
৩. ন্যায়বিচারের পক্ষে কথা বলুন
ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ হচ্ছে ন্যায়ের পক্ষে কথা বলা। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়, যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে না, সে প্রকৃতপক্ষে অন্যায়েরই সহযোগী।
নিরপেক্ষতার ধারণা দেখতে যতই মহৎ মনে হোক না কেন, এটি বাস্তবে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়ার একটি উপায় হতে পারে। বরং সত্য, ন্যায় ও নৈতিকতার পক্ষে অবস্থান নেওয়াই মানুষের প্রকৃত কর্তব্য। কারণ ন্যায় প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো সমাজ টিকে থাকতে পারে না।
তাই আসুন, আমরা নিরপেক্ষ না থেকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হই।