আধুনিক বিশ্ব এবং ইসলামের প্রাসঙ্গিকতা
আধুনিক বিশ্বে ইসলামকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে হলে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি মূলনীতি বুঝতে হবে: মানুষ যা কিছু সত্য বা বাস্তব বলে দাবি করে, তার সবকিছুই আসলে সত্য বা বাস্তব নয়। অনেক সময় বৃহৎ জনগোষ্ঠী একটি ধারণাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। সেটা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় এবং বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেসব ধারণা অনেক সময় কল্পনা বা অপূর্ণ সত্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি।
ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক প্রসঙ্গ: সত্যের বিকৃত রূপ
মানব ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা ঘটেছে যেখানে মিথ্যা ধারণাকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। ধর্মীয় ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে সুস্পষ্ট। বহু সমাজ মিথ্যা উপাস্যদের পূজা করেছে, ভিত্তিহীন কুসংস্কারের উপর ভিত্তি করে ধর্ম গড়ে তুলেছে।
অন্যদিকে, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা বিরল নয়। উদাহরণস্বরূপ, ইথার, ফ্লোজিস্টন, করপাস্কলস ইত্যাদি ধারণাগুলো এক সময় বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সত্য বলে বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু পরে দেখা গেল, এগুলোর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই।
এতে একটি শিক্ষা পাওয়া যায়—যে কোনো ভুলকে সত্য বলে মেনে নেওয়ার প্রবণতা ইতিহাসে বারবার ঘটেছে। এমনকি বিজ্ঞান বা গবেষণার মতো যৌক্তিক ক্ষেত্রেও এটি ঘটে।
আধুনিক নৈতিকতার প্রশ্নবোধকতা
আধুনিক বিশ্বে নৈতিকতার অনেক ধারণা ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য হলেও, সেগুলোর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি। উদাহরণস্বরূপ:
বাকস্বাধীনতামুক্তচিন্তা
ধর্মীয় স্বাধীনতা
গণতন্ত্র
যৌন স্বাধীনতা
লিঙ্গ পরিবর্তনের স্বাধীনতা
এগুলোকে আধুনিক সমাজ চিরসত্য হিসেবে মেনে নিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এগুলোর পক্ষে যৌক্তিক বা নৈতিক ভিত্তি কতটা দৃঢ়? অনেক ক্ষেত্রে এগুলো পশ্চিমা অ্যাকাডেমিয়ার প্রভাবিত সামষ্টিক কল্পনার ফসল মাত্র।
ইসলামের বিপরীতে আধুনিকতার দ্বিমুখিতা
আধুনিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে ইসলামকে সমালোচনা করা হয়। যেমন, ইসলাম বাকস্বাধীনতা, মুক্তচিন্তা, বা ধর্মীয় স্বাধীনতাকে প্রচলিত অর্থে সমর্থন করে না। কিন্তু আধুনিক মূল্যবোধের সত্যতা যাচাই না করে, সেগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ না করেই, ইসলামের শিক্ষাকে সমালোচনা করা কতটা যৌক্তিক?
এ প্রশ্ন করার মতো সাহসী অবস্থান গ্রহণ করাই হলো সংশয়বাদিতার প্রথম ধাপ। কিন্তু দুঃখজনক হলো, অনেক মুসলিম আলিম এবং বুদ্ধিজীবী এই সংশয়বাদিতার পথ এড়িয়ে চলেন।
কৈফিয়তবাদী পদ্ধতির দুর্বলতা
বেশ কিছু মুসলিম বুদ্ধিজীবী আধুনিক মূল্যবোধকে সত্য ধরে নিয়ে ইসলামের বিভিন্ন অংশকে সেভাবে ব্যাখ্যা করেন। উদাহরণস্বরূপ, তারা কুরআন এবং হাদীস থেকে মুক্তচিন্তার সমর্থনে উদাহরণ তুলে ধরেন। কিন্তু সমস্যা হলো, একপক্ষীয়ভাবে শুধু সুবিধাজনক অংশকে তুলে ধরার মাধ্যমে পুরো সত্যকে প্রতিফলিত করা সম্ভব নয়।
এ পদ্ধতির বিপরীতে ইব্রাহিম (আ.) এর পদ্ধতি অনুসরণ করাই আমাদের জন্য আদর্শ। তিনি কাফেরদের মিথ্যা উপাস্যদের অসারতা তুলে ধরে সত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
ইসলাম: সত্য অনুসন্ধানের পথ
ইসলাম সত্যের ধর্ম। এর শিক্ষা যৌক্তিক, আত্মিক এবং বাস্তবিক সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সত্যের অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যেন আধুনিক বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রভাবিত হয়ে কোনো ত্রুটিপূর্ণ ধারণা আমাদের চিন্তার জগতে প্রবেশ না করে।
তিনটি জ্ঞানের উৎস
ইসলাম আমাদের তিনটি উৎসের প্রতি গুরুত্ব দিতে বলে:
আত্মিক অনুভব: ইবাদাত, যিকর, এবং তিলাওয়াতের মাধ্যমে অর্জিত অভিজ্ঞতা।
প্রামাণিক উৎস: কুরআন, সুন্নাহ, এবং আলিমদের জ্ঞান।
আধুনিকতার ভিত্তি খণ্ডন: বাস্তবতা উন্মোচন
আধুনিক বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি যেসব মূল্যবোধের উপর দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলোর অসারতা বুঝতে হলে সেগুলোর ভিত্তি বিশ্লেষণ করতে হবে। এগুলোর অসংগতি, দ্বিমুখিতা, এবং ভ্রান্তি ধাপে ধাপে উন্মোচন করতে হবে।
যদি আমরা তাদের যুক্তিগুলো খণ্ডন করতে পারি, তাহলে একসময় তাদের মূল্যবোধের অন্তঃসারশূন্যতা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। এটি করার জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, গভীর অধ্যয়ন, এবং যথাযথ প্রক্রিয়ার অনুসরণ।
সত্যের সন্ধানে ইসলামের ভূমিকা
ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যা মানুষকে সত্য ও বাস্তবতা সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি অর্জনের সুযোগ দেয়। আধুনিক মূল্যবোধের বিপরীতে ইসলামের অবস্থান আরও দৃঢ় এবং যৌক্তিক।
আল্লাহ আমাদের সত্যের সন্ধান এবং সঠিক উপলব্ধির তাওফিক দিন। আমীন।