বাংলাদেশের ইতিহাসে পাকিস্তান ও আওয়ামী লীগ, দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি, দেশের জনগণের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। পাকিস্তান একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নিয়েছিল, যেখানে মুসলিম জনগণের জন্য একটি স্বাধীন আবাসস্থল প্রতিষ্ঠার আদর্শ ছিল। তবে এর শুরু থেকেই রাজনৈতিক সংকট এবং শাসন ব্যবস্থার বৈষম্যের কারণে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ নিপীড়নের শিকার হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের সাংস্কৃতিক, ভাষাগত এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের জন্য অবর্ণনীয় কষ্টের কারণ হয়েছিল, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তি তৈরি করে।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী একটি দল হিসেবে বাঙালি জাতির মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। তবে স্বাধীনতার পর তাদের শাসন ব্যবস্থায় একটি ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। প্রথম দিকে বাঙালি জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার স্লোগান দিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেয়ে ক্ষমতা ভোগে মনোনিবেশ করে। তাদের শাসনব্যবস্থার রূপ ক্রমে এমন এক ধরণের কর্তৃত্ববাদী শাসনে পরিণত হয়, যা দ্বিতীয় পাকিস্তানের প্রতিচ্ছবি তৈরি করেছে।
আজকের আওয়ামী লীগ সরকারকে অনেকে এমন একটি ফ্যাসিস্ট শাসনব্যবস্থা হিসেবে দেখেন, যেখানে জনগণের মৌলিক অধিকার বারবার খর্ব করা হয়। ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল এর চূড়ান্ত উদাহরণ, যেখানে সরকার ছাত্র-জনতার ওপর দমনমূলক আচরণ করেছে। যুগের পর যুগ মধুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাঙালি জনগণকে প্রতারিত করে আওয়ামী লীগ যেন দ্বিতীয় পাকিস্তান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণ এখনো শোষণের চক্রে বন্দি। পাকিস্তানের শাসনকাল থেকে শুরু করে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অত্যাচার—উভয়ের মধ্যকার মিল এবং অমিলগুলো বিশ্লেষণ করাই আজ জরুরি। এ বিশ্লেষণ শুধু ইতিহাসকে নয়, ভবিষ্যতের জন্য সঠিক পথচলাকে নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
গত 15-20 বছরে সাধারণ জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করে ভোট চুরির মাধ্যমে বারবার নিজে ক্ষমতা গ্রহণ এবং বিরোধী দল দমনের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলা দিয়ে অন্যায় ভাবে নির্যাতন করা হত্যা ঘুম ইত্যাদির মাধ্যমে বিরোধী দলকে নিশেষ করে দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আঙ্গুল তুললে তাদের বিরুদ্ধে কথা বললে হতে হয়েছে দেশদ্রোহী জঙ্গি, অপরদিকে তারা অন্যায়ের সাম্রাজ্য এই বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করেছে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে।
পাকিস্তানের শাসন ও বৈষম্য
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই সেখানে রাজনৈতিক সংকটের সূচনা হয়েছিল। বিশেষ করে পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে সাংস্কৃতিক, ভাষাগত এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল প্রকট। এই বৈষম্যগুলি পরবর্তীতে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি তৈরি করেছিল। পূর্ব পাকিস্তানকে উপেক্ষা করে পশ্চিম পাকিস্তান শাসন চালাত, আর তার ফলে সাধারণ জনগণ নির্যাতিত হতে থাকে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়, এবং অগণিত মানুষকে অত্যাচারের শিকার হতে হয়।
আওয়ামী লীগের ক্ষমতা গ্রহণ ও জনগণের প্রতি মনোভাব
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ প্রথম দিকে বাঙালি জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বললেও, তাদের লক্ষ্য ছিল মূলত ক্ষমতা দখল করে জনগণকে শাসন করা। পাকিস্তানের অত্যাচারের হাত থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের জনগণের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে, কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তারা সাধারণ জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেয়ে নিজস্ব ক্ষমতার জোরালো অবস্থানকে সুসংহত করতে মনোযোগ দেয়। এটি এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করে যেখানে জনগণ এক ধরনের দ্বিতীয় অত্যাচারের শিকার হতে থাকে—একটি নতুন ফ্যাসিবাদী সরকারের শাসনভীতি।
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতার জন্য যে আন্দোলন হয়েছিল, তা ছিল গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারের প্রতিষ্ঠা, কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেগুলোর প্রতি তাদের এক ধরনের উদাসীনতা দেখা যায়। যদিও দেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর তাদের প্রচার ছিল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার, তবে বাস্তবে তারা একক সংখ্যাগরিষ্ঠ লাভ করার পরেও সাধারণ জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা না করে এককভাবে ক্ষমতার দখল কৌশল তৈরি করতে থাকে। এ কারণে একদিকে যেমন পাকিস্তানী শাসনকালের বৈষম্য ছিল, তেমনি আওয়ামী লীগও গণতন্ত্রের নামে এক ধরনের একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য পেছনে পেছনে কাজ করেছে।
কোটা সংস্কার আন্দোলন: এক আধিপত্যবাদী শাসনের চূড়ান্ত প্রকাশ
আওয়ামী লীগ সরকারের অত্যাচারের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছে ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে। ছাত্রদের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী, কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য আন্দোলন গড়ে উঠলে, আওয়ামী লীগ সরকার তাদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ শুরু করে। ছাত্রদের ওপর পুলিশি আক্রমণ, রাস্তায় ব্যাপক ধরপাকড় এবং আন্দোলন দমনের জন্য একাধিকারী শাসন ব্যবস্থা প্রকাশ পায়। কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতি সরকার যে শাসক মনোভাব দেখিয়েছে, তা ছিল স্পষ্টভাবে ফ্যাসিবাদী, যেখানে সাধারণ জনগণের অধিকার উপেক্ষিত হয়ে যায়।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার আওয়ামী লীগের বর্তমান শাসনামলে বারবার লঙ্ঘিত হয়েছে। গত ১৫-২০ বছর ধরে, আওয়ামী লীগ সরকার বারবার ক্ষমতায় থাকার জন্য ভোট চুরি, বিরোধী দল দমন এবং নির্যাতনের এক অন্ধকার অধ্যায় সৃষ্টি করেছে।
ভোট চুরির মাধ্যমে ক্ষমতা দখল
২০০৮ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে, আওয়ামী লীগ ক্রমশ ভোটের প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে।
ভোট চুরি ও নির্বাচনী প্রহসন: ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে দেখা গেছে, জনগণ ভোট দিতে না পারলেও ক্ষমতাসীন দল জয়লাভ করে। রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তি এবং বিরোধী দলকে মাঠে নামতে না দেওয়া—এই কৌশলগুলোর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ভোটের অধিকার হরণ করেছে।
ইভিএম কৌশল ও প্রশাসনের ব্যবহার: নির্বাচনী ব্যবস্থায় ইভিএম প্রযুক্তি এবং প্রশাসনকে ব্যবহার করে ভোটের ফলাফল নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসার অভিযোগ উঠেছে বারবার।
বিরোধী দল দমন ও নির্যাতন
আওয়ামী লীগ তাদের শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য বিরোধী দলগুলোর ওপর দমনমূলক নীতি গ্রহণ করেছে।
রাজনৈতিক মামলা ও গ্রেপ্তার: বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই এখন জেলে বন্দি, আর কেউ কেউ প্রাণ হারিয়েছেন।
গুম ও হত্যার রাজনীতি: যারা আওয়ামী লীগের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছে, তাদের অনেকেই নিখোঁজ হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথাকথিত ক্রসফায়ার এবং গুমের ঘটনা বাংলাদেশে স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশদ্রোহী ও জঙ্গি তকমা: আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কথা বললেই দেশদ্রোহী বা জঙ্গি বলে চিহ্নিত করার একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।
অর্থ পাচার ও অন্যায় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা
আওয়ামী লীগের শাসনামলে দুর্নীতি এবং অর্থ পাচারের মাধ্যমে দেশকে একটি অন্যায় সাম্রাজ্যে পরিণত করা হয়েছে।
অর্থ পাচার: হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মতো ঘটনা প্রমাণ করে যে ক্ষমতাসীন দলের ছত্রচ্ছায়ায় এই অপরাধ সংগঠিত হয়েছে।
দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: দেশের প্রতিটি সেক্টরে দুর্নীতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সাধারণ মানুষ কোনো সেবা পেতে হলে ঘুষ দিতে বাধ্য।
ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি: শীর্ষ নেতাদের সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশাকে উপেক্ষা করে সম্পদ লুণ্ঠনের ইঙ্গিত দেয়।
স্বৈরতন্ত্রের সাম্রাজ্য
আওয়ামী লীগ দেশের গণতন্ত্রের কাঠামো ধ্বংস করে একটি একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার দিকে অগ্রসর হয়েছে।
মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ: স্বাধীন সাংবাদিকতা দমন এবং বিরোধী কণ্ঠ রোধ করার জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।
আইন ও প্রশাসনের অপব্যবহার: প্রশাসন, বিচার বিভাগ, এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ক্ষমতাসীন দলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
জনগণের ভবিষ্যৎ কোথায়?
আওয়ামী লীগের এই দমনমূলক শাসন প্রমাণ করে যে, তারা জনগণের সেবার জন্য নয় বরং নিজেদের ক্ষমতা সংহত করার জন্য দেশ পরিচালনা করছে।
গণতন্ত্রের জন্য মুক্তির লড়াই এখন আরো কঠিন হয়েছে।
সাধারণ জনগণ যখন আওয়ামী লীগের এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছে, তখন তারা দেশদ্রোহী এবং জঙ্গি বলে চিহ্নিত হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ: দ্বিতীয় পাকিস্তান?
বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ নিজেদের গণতান্ত্রিক দল হিসেবে প্রচার করেছে, কিন্তু তাদের শাসন ব্যবস্থার বাস্তবতা জনগণের জন্য কখনোই সুখকর ছিল না। স্বাধীনতার পর পাকিস্তান থেকে মুক্ত হওয়ার আশ্বাস দিয়ে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ, পরবর্তীতে তা বাস্তবে একটি নতুন "পাকিস্তান" তৈরি করেছে, যেখানে সাধারণ জনগণ আবারো অত্যাচারের শিকার হয়েছে। এই দলটি ক্ষমতার মোহে জাতির কল্যাণের চেয়ে নিজের রাজনৈতিক শাসনকে দীর্ঘায়িত করতে মনোযোগী হয়েছে।
পাকিস্তান এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে পার্থক্য বেশ স্পষ্ট—একদিকে পাকিস্তান শাসকদের দমন-পীড়ন এবং জাতিগত বৈষম্য, অন্যদিকে আওয়ামী লীগও স্বাধীনতার পর দমনমূলক শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারছে, যেটি কখনো জনগণের মুক্তির জন্য কাজ করেনি। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমেই যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, তা বাস্তবে এখন একটি একনায়কতন্ত্রের রূপ ধারণ করেছে। এভাবে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে জনগণের ঐক্য ও অধিকারের প্রতি যে অবহেলা দেখিয়েছে, তা এক ধরনের দ্বিতীয় পাকিস্তানের সৃষ্টি করেছে—এমন এক ফ্যাসিস্ট শাসন যা জনগণের মৌলিক অধিকারকে খর্ব করে ক্ষমতার আসনে বসতে চায়