ধর্ম শুধু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, রোজা রাখা কিংবা মুখে কিছু বুলি উচ্চারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়

ধর্ম শুধু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, রোজা রাখা, কিংবা মুখে কিছু বুলি উচ্চারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র—ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তার করে। ধর্মের মূল উদ্দেশ্য হল মানবজীবনকে সঠিক পথনির্দেশনা দিয়ে দুনিয়া এবং আখিরাতের সাফল্য নিশ্চিত করা। তাই রাষ্ট্র পরিচালনায় ধর্মের ভূমিকা অস্বীকার করা বা সেটিকে ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ করা একপ্রকার অন্ধত্ব।

রাষ্ট্র পরিচালনা ও ধর্মের সম্পর্ক

অনেকেই মনে করেন, রাষ্ট্র পরিচালনা ধর্মের বাইরে হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র একটি সমাজের প্রতিচ্ছবি। যখন সমাজের মৌলিক নীতি ও মূল্যবোধ ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত, তখন রাষ্ট্র কীভাবে ধর্ম থেকে পৃথক থাকতে পারে? আমরা বিশ্বাস করি, রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি ও আদর্শ অবশ্যই ধর্মের ওপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত। কারণ ধর্ম মানবজাতিকে ন্যায়, নীতি, এবং সমতা শেখায়, যা একটি রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি।

ধর্মকে রাষ্ট্রপরিচালনা থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা শুধু অজ্ঞতাপ্রসূত নয়, এটি মানবজাতির প্রতি অন্যায়। ইতিহাস প্রমাণ করে, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কেবল ধর্মীয় নীতির মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইসলামের স্বর্ণযুগে খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনব্যবস্থা একটি উজ্জ্বল উদাহরণ, যেখানে ন্যায়বিচার, জনকল্যাণ, এবং সততা রাষ্ট্রপরিচালনার মূল ভিত্তি ছিল।

ক্ষমতার উদ্দেশ্য: লোভ নাকি সেবা?

অনেকে বলে থাকেন, জামাতে ইসলামী ক্ষমতায় যেতে চায় শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য। তাদের কাছে প্রশ্ন, আপনারা কেন ক্ষমতায় যেতে চান? যদি আপনারা মনে করেন, ক্ষমতায় যাওয়া কেবল এক ব্যক্তিগত অর্জন, তাহলে তা কি দুনিয়াবি লোভ নয়? আমরা স্পষ্টভাবে বলি, জামাতে ইসলামী ক্ষমতায় যেতে চায় জনগণের সেবা এবং আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের জন্য।

ক্ষমতা একটি দায়িত্ব। যারা ক্ষমতাকে লোভ, বিলাসিতা, এবং স্বার্থপরতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তারা প্রকৃতপক্ষে মানুষের শত্রু। অথচ যারা ক্ষমতাকে জনগণের সেবায় নিয়োজিত করে, তারা সত্যিকারের জননেতা। জামাতে ইসলামী কখনো দুনিয়াবি স্বার্থ পূরণের জন্য রাজনীতি করেনি। বরং এটি এমন একটি সংগঠন, যা ন্যায়বিচার, জনকল্যাণ এবং ইসলামের মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে কাজ করে।

জামাতে ইসলামীর পরিষ্কার অবস্থান

আমরা প্রকাশ্যে ঘোষণা করি, জামাতে ইসলামী ক্ষমতায় যেতে চায় শুধুমাত্র আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন করার জন্য। আমাদের লক্ষ্য জনগণের জন্য এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে সবাই ন্যায়, সমতা এবং নিরাপত্তা পাবে। আমাদের এজেন্ডা স্পষ্ট:

  1. শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা: অপরাধমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন।
  2. নৈতিক শাসনব্যবস্থা: দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং সৎ নেতৃত্ব।
  3. অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: সুদমুক্ত অর্থনীতি এবং দরিদ্রদের কল্যাণ নিশ্চিত করা।
  4. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করা।
  5. আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার: মুসলিম উম্মাহর স্বার্থ রক্ষা এবং বৈষম্যের অবসান ঘটানো।

অনেকে অভিযোগ করেন, জামাতে ইসলামী ধর্মের নামে রাজনীতি করে। তাদের কাছে আমাদের প্রশ্ন, আপনারা কী রাজনীতি করেন? রাজনীতির উদ্দেশ্য যদি জনগণের সেবা হয়, তাহলে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে দোষের কিছু মনে করার সুযোগ নেই। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, যারা ধর্মের বাইরে রাজনীতি করেন, তারা কী উদ্দেশ্যে রাজনীতি করেন? তাদের এজেন্ডা কী?

আমাদের আরেকটি প্রশ্ন, আপনারা কেন ক্ষমতায় যেতে চান? ক্ষমতায় গিয়ে আপনি কী করবেন? ভোগ-বিলাসিতা, নারী-লিপ্সা, অথবা দুনিয়াবি স্বার্থ চরিতার্থ করবেন? এগুলো তো পাপিষ্ঠ রাজনীতিবিদদের কাজ। যারা ক্ষমতায় গিয়ে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়, তাদের সঙ্গে জামাতে ইসলামীর পার্থক্য পরিষ্কার।

জামাতের সততা

জামাতে ইসলামীর ইতিহাস প্রমাণ করে, তাদের নেতৃত্ব কখনো দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়নি। আজ পর্যন্ত জামাতের এমপি বা মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির প্রমাণ নেই। তাহলে কিভাবে বলা হয় যে, জামাতের হাতে দেশ ও জাতি নিরাপদ নয়? বরং যারা দুর্নীতি, লুটপাট, এবং অপশাসনের মাধ্যমে রাষ্ট্র চালিয়েছে, তাদের হাতেই দেশ বিপন্ন হয়েছে।

ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা

আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, একটি সুষ্ঠু ও উন্নত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার একমাত্র উপায় হল ধর্মীয় নীতি ও আদর্শের অনুসরণ। ধর্ম কোনো সংকীর্ণ বিষয় নয়। এটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়। যখন একটি রাষ্ট্র ধর্মীয় নীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়, তখন সে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জন্য শান্তি, সমৃদ্ধি, এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়।

ইসলামের শিক্ষা কেবল নামাজ, রোজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের শেখায় কিভাবে সৎভাবে জীবনযাপন করতে হয়, কিভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হয়, এবং কিভাবে জনগণের কল্যাণে কাজ করতে হয়।

রাষ্ট্র পরিচালনা কখনো ধর্মের বাইরে হতে পারে না। যারা মনে করেন, ধর্ম শুধুমাত্র ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ, তারা হয়তো ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝেননি। জামাতে ইসলামী কোনো ক্ষমতালোভী সংগঠন নয়। এটি একটি আদর্শিক সংগঠন, যা আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের সেবা করার জন্য কাজ করে। আমাদের প্রশ্ন রয়ে গেল: আপনি কেন ক্ষমতায় যেতে চান? ক্ষমতায় গিয়ে আপনি কী করবেন? জনগণের সেবা, নাকি নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করবেন? উত্তরের জন্য আপনাদের বিবেকের কাছে আবেদন জানাই।


Thanks For Comment we are reply soon as possible.

Previous Post Next Post