সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফোনটা হাতে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার নোটিফিকেশন চেক করেন? তারপর এক কাপ চা হাতে নিয়ে ক্যামেরার সামনে কাপটা একটু কোণ করে ধরেন—ছবিটা যেন ঠিকমতো আসে। ক্যাপশন? “Peaceful morning with tea”। এরপর ছুটে যান অফিসে, সিএনজি না পেলে মুখ ভার, যেন আপনি রাষ্ট্রদূত।
রাত হলে খাবারের ছবি তুলে পোস্ট দেন—“Dinner with family”। খাবারের মেন্যুটা হয়তো ডাল আর ভাজি, কিন্তু ফিল্টার এমন যে দেখে মনে হয় পাঁচ তারকা হোটেলের ছবি।
ইউটিউবে একটা ফ্রি কোর্সে নাম লিখিয়েছেন, নিজের নামের পাশে ‘ডিজিটাল মার্কেটার’, ‘গ্রাফিক ডিজাইনার’, ‘আইটি এক্সপার্ট’ এসব তকমা জুড়ে দিচ্ছেন, যেন আপনি গুগলের সিইও। অথচ এখনও মাস শেষে মায়ের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার না করলে চলা মুশকিল।
পাশের বাসার ভাবি সব সুখী, শুধু আমি না!
রুবিনা আপা। জামাই দুটো চাকরি করে। সকালে যায় অফিসে, রাতে আবার একটা টিউশন সেন্টারে ক্লাস নেয়। অথচ তাতেও রুবিনার মন ভরে না। সারাদিন মুখ ভার, জামাইকে নিয়ে মন কষাকষি। কারণ পাশের বাসার ভাবি নাকি সপ্তাহে দুইবার মার্কেট করে, জামাই নাকি গিফট দেয়, হাতে হাত ধরে হাঁটে।
তার মাথায় এখন সেট হয়ে গেছে—যে জামাই আদর না করলে, প্রতি সপ্তাহে রেস্টুরেন্টে না নিলে, সপ্তাহে অন্তত একবার শপিং না করালে—সে ভালো স্বামী না। তার মনে হয়, পাশের বাসার সবাই সুখী, শুধু সে-ই কষ্টে আছে। অথচ পাশের বাসার ‘সুখ’ বলতে যা বোঝে, সেগুলোর ৮০% হচ্ছে দেখানোর জিনিস।
প্লাস্টিকের বোতলে পানি নেন, কিন্তু বোতলটা যেন ব্র্যান্ডেড হয়।
রিকশায় চড়েন ঠিকই, কিন্তু কেউ যেন না দেখে। হেঁটে হেঁটে হাঁপিয়ে উঠেন, তবু Uber ডেকে স্ট্যাটাস দেন—“Comfortable ride, thanks to technology”।
আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে কত আছে সেটা আপনি জানেন, কিন্তু কেউ যেন না জানে—এই নিয়েই যত ভাবনা। আপনার ভেতরটা খালি, কিন্তু বাইরের মোড়ক যেন চকচকে হয়—এই নিয়ে হাজারো চেষ্টা।
এভাবে কতোদূর?
আমরা ছোট ছোট কাজকে বড় করে দেখাতে গিয়ে, আসল কাজটাই ভুলে যাচ্ছি। নিজের বাস্তবতাকে মেনে নিতে লজ্জা হচ্ছে। ছোট চাকরি করি, কম টাকা পাই—তাতে দোষ কোথায়? সমস্যা তখনই, যখন আমরা বাস্তবতা ঢাকতে মিথ্যা আড়াল খুঁজি।
আমাদের সমস্যাটা কী জানেন?
আমরা বাস্তবতা মেনে চলতে পারি না। আমাদের গরিব ভাব, কষ্টের গল্প, অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা—এসব লুকাতে গিয়ে এমন একটা মুখোশ পরে ফেলি যেটা খুলতেই আর সাহস হয় না।
ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের ছবিতে সব হাসছে, কিন্তু বাস্তবে ঠোঁট শক্ত করে রাখা যায় না। হোম টিউশন পড়িয়ে সংসার চালাচ্ছেন যিনি, তার মনে হচ্ছে তিনি ব্যর্থ; আর যিনি ঘরে বসে পাশের ভাবির জামাইয়ের তুলনা করেন, তিনি আরও হতাশ।
সমাধানটা খুব সহজ:
১. নিজের জীবনকে নিজের মতো করে সাজান।
২. অন্যের জামাই, বৌ, সংসার দেখে নিজের সুখকে প্রশ্ন করবেন না।
৩. স্বামীর পরিশ্রমকে সম্মান করুন, তার পকেট নয়—তার চেষ্টা দেখুন।
৪. সুখ দেখাতে নয়, সুখ পেতে শিখুন।
৫. ছোট চাকরি করলেও গর্ব করুন—আপনি পরিশ্রমী।
৬. হেঁটে চললে নিজেকে ছোট মনে করবেন না—এটাই স্বাস্থ্যকর।
৭. ব্র্যান্ড নয়, কাজকে গুরুত্ব দিন।
৮. সত্যিকারের অর্জন হোক মুখবন্ধ নয়, মন খুলে।
ছোট কাজ, ছোট উপার্জন, ছোট সুখ—এসব ছোট ছোট জিনিসের মধ্যেই যদি ভালোবাসা থাকে, শ্রদ্ধা থাকে, স্বীকৃতি থাকে—তবেই জীবন বড় হয়।
না হলে ফেসবুকের একশোটা লাভ রিঅ্যাকশনও জীবনটা ভালো করতে পারে না। © Delowar Hossen