ইসলামের প্রথম মাদ্রাসা আস-সাফফা থেকে আমাদের শিক্ষা ও করণীয়:
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। এটি কেবল ইবাদত, আক্বিদা, ফিকহ ও তাসাউফের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি চিকিৎসা, প্রযুক্তি, রাষ্ট্রনীতি ও সামরিক কৌশলসহ মানবজীবনের সর্বস্তরে দিকনির্দেশনা প্রদান করে। অথচ আজ আমরা ইসলামের মূল শিক্ষা থেকে দূরে সরে গিয়ে একটি সংকীর্ণ ধারার মধ্যে মাদ্রাসা শিক্ষাকে বন্দি করে ফেলেছি। ফলে আমাদের সামগ্রিক পতন ঘটেছে—বুদ্ধিবৃত্তিক, প্রযুক্তিগত এবং রাজনৈতিকভাবে।
আজকের মুসলিম সমাজে আমরা দেখতে পাই—মাদ্রাসা শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে এক গভীর বিভাজন। এমন এক সময়ে, যখন আমাদের শত্রুরা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও বিজ্ঞান ব্যবহার করে আমাদের ওপর চতুর আঘাত হানছে, তখন আমরা নিজেদের মধ্যে ফতোয়া ও বিভেদ নিয়ে ব্যস্ত। প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলাম কি আমাদের আধুনিক জ্ঞান অর্জনের অনুমতি দেয় না? আর যদি দেয়, তবে কেন মাদ্রাসা শিক্ষায় আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা ও প্রতিরক্ষা জ্ঞান সংযুক্ত করা হচ্ছে না?
আস-সাফফা: ইসলামের প্রথম মাদ্রাসা ও আধুনিকতার সূতিকাগার:
মদিনার মসজিদে নববির পাশে রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি বিশেষ স্থান নির্মাণ করেন, যেটিকে বলা হয় আস-সাফফা। এটি ছিল ইসলামের সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিক শিক্ষাকেন্দ্র। এখানে শুধুমাত্র কুরআন হাদীস শেখানো হতো না, বরং চিকিৎসা, গণনা, ক্যালিগ্রাফি, রণনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানও শেখানো হতো।
তাফসিরকারগণ বলেন, এখানে সাহাবীরা রাত্রি যাপন করতেন, অনুশীলন করতেন, পরামর্শ নিতেন এবং জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণে অংশগ্রহণ করতেন। এই শিক্ষাব্যবস্থা ছিল সময়োপযোগী ও বহুমাত্রিক।
আধুনিক যুগে মাদ্রাসার সংকীর্ণ পাঠ্যক্রম: কেনো এই পতন?
বর্তমান সময়ে অধিকাংশ মাদ্রাসায় শুধু ফিকহ, কুরআন, হাদীস, এবং কিছু অংশের আরবি সাহিত্যে সীমাবদ্ধ পাঠ্যক্রম চালু রয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, গণিত, ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান কিংবা অর্থনীতি এসব বিষয়কে ‘জাহিলি’ বিদ্যা হিসেবে দেখা হয় অনেক ক্ষেত্রে। অথচ...
আল্লাহ বলেন:
"বল, যারা জানে এবং যারা জানে না—তারা কি সমান হতে পারে?"
—(সূরা যুমার, ৩৯:৯)
আল্লাহ নিজেই জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু আজ আমরা সেই জ্ঞানকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলেছি—একটা জ্ঞান হালাল, আরেকটা হারাম, এমন ভুল ধারণা দিয়ে।
আধুনিক যুগে মাদ্রাসা শিক্ষার সংকীর্ণতা:
বর্তমানে মাদ্রাসার শিক্ষা কারিকুলামে ধর্মীয় জ্ঞান থাকলেও আধুনিক বিজ্ঞান, চিকিৎসা, প্রযুক্তি বা সামরিক বিজ্ঞানের চর্চা নেই বললেই চলে। অথচ ইসলামের প্রথম যুগে এসব বিদ্যা ইসলামী শিক্ষারই অংশ ছিল।
অধিকাংশ মাদ্রাসা এখনো কেবল হাদীস, ফিকহ, কুরআনের তাফসিরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
অনেক আলেম বিজ্ঞানকে কেবল পাশ্চাত্য চিন্তার ফসল মনে করেন এবং একে ধর্মবিরোধী ভাবেন।
আধুনিক কারিকুলাম নেই বলেই মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা মূলধারার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে না।
আধুনিক শিক্ষার প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি:
১. বিজ্ঞানের প্রতি কুরআনের উৎসাহ:
"আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, রাত্রি ও দিনের পরিবর্তনে, জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।"
—(সূরা আলে ইমরান, ৩:১৯০)
আল্লাহ আমাদেরকে অন্বেষণ, পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের আদেশ দিয়েছেন। এসব আয়াত আমাদেরকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চার প্রতি আহ্বান জানায়।
২. চিকিৎসাবিজ্ঞানে মুসলিম অবদান:
আল রাজি, ইবনে সিনা, আল জাহরাভি প্রমুখ মুসলিম চিকিৎসাবিদগণ ইউরোপীয় রেনেসাঁর ভিত্তি স্থাপন করেন। আজ আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি যেটি অনুসরণ করে, সেটির মূল কাঠামো অনেকাংশেই মুসলিম চিকিৎসা জ্ঞানের অবদান।
৩. সামরিক কৌশল ও প্রযুক্তি:
রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেই যুদ্ধের সময় খন্দক খনন, গুপ্তচরবৃত্তি, ও প্রযুক্তিগত কৌশল গ্রহণ করেছিলেন।
"তাদের বিরুদ্ধে প্রস্তুত কর যা কিছু শক্তি সঞ্চয় করো..."
—(সূরা আনফাল, ৮:৬০)
এই আয়াত কেবল ঐতিহ্যগত অস্ত্র নয় বরং আধুনিক অস্ত্র, ড্রোন, সাইবার প্রতিরক্ষা এবং সামরিক প্রযুক্তিও এর অন্তর্ভুক্ত করে।
শত্রুরা যখন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধ্বংসে তৎপর
বর্তমান বিশ্বে মুসলিমদের দুর্বলতা ও পশ্চাদপদতার মূল কারণ হলো—আমরা জ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে পিছিয়ে।
ইহুদি-খ্রিস্টান বিশ্বের দেশগুলো সামরিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জেনেটিক গবেষণা, মহাকাশ বিজ্ঞান, ওষুধ আবিষ্কার ইত্যাদি ক্ষেত্রে অগ্রগামী।
সিরিয়া, ইয়েমেন, ফিলিস্তিনের মুসলিমরা তাদের অস্তিত্ব রক্ষার মতো সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছে মূলত শিক্ষা ও প্রযুক্তির অভাবে।
আমাদের করণীয়- মাদ্রাসা কারিকুলামে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সংযুক্তি:
১. আধুনিক কারিকুলাম প্রবর্তন:
মাদ্রাসায় বিজ্ঞান, গণিত, প্রযুক্তি, ইতিহাস, রাষ্ট্রনীতি, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, সাইবার নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয় বাধ্যতামূলক করতে হবে।
২. মুসলিম তরুণদের প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জনে উৎসাহ:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “বলিষ্ঠ মুমিন দুর্বল মুমিন থেকে উত্তম।”
—(সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৬৪)
বলিষ্ঠতা এখানে কেবল দেহগত নয়, মানসিক, শিক্ষাগত ও কৌশলগত বলিষ্ঠতা বোঝানো হয়েছে।
৩. প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণা তহবিল গঠন:
মুসলিম দেশগুলোকে সামরিক ও চিকিৎসা প্রযুক্তিতে স্বনির্ভর হতে হবে। এর জন্য সরকারি পর্যায়ে বিজ্ঞানচর্চায় ব্যাপক অর্থায়ন জরুরি।
বর্তমান অবস্থা: বিভাজন ও পিছিয়ে পড়ার কারণ:
শত্রুরা যখন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ধ্বংসে তৎপর
বর্তমান বিশ্বে মুসলিমদের দুর্বলতা ও পশ্চাদপদতার মূল কারণ হলো—আমরা জ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে পিছিয়ে।
ইহুদি-খ্রিস্টান বিশ্বের দেশগুলো সামরিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জেনেটিক গবেষণা, মহাকাশ বিজ্ঞান, ওষুধ আবিষ্কার ইত্যাদি ক্ষেত্রে অগ্রগামী।
সিরিয়া, ইয়েমেন, ফিলিস্তিনের মুসলিমরা তাদের অস্তিত্ব রক্ষার মতো সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছে মূলত শিক্ষা ও প্রযুক্তির অভাবে।
আমরা নিজেদের মধ্যে একতেলাফি মাসায়েলের উপর বিতর্কে এতটাই ব্যস্ত যে শত্রুরা আমাদের গলা কেটে ফেললেও আমরা শুধু বলি—"তুমি হানাফি না সালাফি?" অথচ… আল্লাহ বলেন,
"তোমরা পরস্পরে বিবাদে লিপ্ত হলে তোমাদের সাহস ভেঙে পড়বে এবং শক্তি হ্রাস পাবে।"
—(সূরা আনফাল, ৮:৪৬)
এখনো সময় আছে — ফিরে আসো বিজ্ঞান ও ঈমানের মিলনে:
আমরা যদি এখনো আধুনিক শিক্ষা ও প্রযুক্তির গুরুত্ব না বুঝি, তাহলে ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইয়ামেনের মতো ধ্বংসের পথেই অগ্রসর হবো। ইসলাম কেবল মসজিদের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি গবেষণাগার, যুদ্ধক্ষেত্র, হাসপাতাল ও মহাকাশে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
আসুন, আধুনিক জ্ঞানকে গ্রহণ করে ইসলামের পতাকাকে বিশ্বমঞ্চে সমুন্নত করি। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কোনোভাবেই হারাম নয়, বরং এটি ইসলামের বিজয় নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য অঙ্গ। এই জ্ঞান অর্জন না করলে মুসলিম জাতি হিসেবে আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।
© Delowar Hossen