আচ্ছা যারা "পাকিস্তান" শব্দ শুনলে চেতনার তৃতীয় লিঙ্গ দাঁড় করিয়ে দেয়, তাদের উদ্দেশ্যে কিছু প্রশ্ন রাখতে চাই। আপনাদের দাদা-নানারা ১৯৭১ সালের পূর্বে কী ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলে স্লোগান দেয়নি?
যারা ইতিহাস ভুলে তৃতীয় লিঙ্গ দাঁড় করিয়ে হুঙ্কার দেয়, তাদের জেনে রাখা উচিত—পাকিস্তানের সাথে পূর্ব বাংলার সম্পর্কটা ছিল ভাইয়ের মতো। একই মায়ের পেটে জন্ম, একই ধর্মীয় পরিচয়ে গড়া দু'টি অঞ্চল—শুধু ভৌগলিক দূরত্ব ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য ছিল বড় বাধা। যেমনটি একই মায়ের গর্ভে জন্ম নেওয়ার দুটি সন্তানের,চেহারা, চরিত্রের আলাদা বৈশিষ্ট্য হয়।
স্বার্থের দ্বন্দ্বকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে তৃতীয় পক্ষ—ভারত, যেটা ১৯৭১ সালের ‘মুক্তিযুদ্ধ’কে রাজনৈতিক ফায়দার প্রকল্পে পরিণত করেছিল, ভারত মূলত ১৯৬১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়েছে।
ভারত ১৯৭১ সালে আমাদের সাহায্য করেছিল—এটা সত্য। কিন্তু এটা নিছক সাহায্য ছিল না। ভারত বুঝেছিল, যদি পাকিস্তানের শরীর থেকে পূর্বাংশ কেটে আলাদা করা যায়, তবে একদিকে যেমন একটি মুসলিম শক্তিকে দুর্বল করা যাবে, অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের আধিপত্য আরও পাকাপোক্ত করা যাবে। তারা ঠিক তাই করেছে।
যেমনটা ব্রিটিশরা করেছিল ধর্মের ভিত্তিতে ভারতবর্ষকে বিভক্ত করে হিন্দু মুসলিমদের দাঙ্গাবাদিয়ে যায়। এইজন্যই ভারত পাকিস্তান দুই ধর্মের চেতনায় রাজনীতি করে।
পাকিস্তান আজও আফসোস করে পূর্ব বাংলাকে হারানোর জন্য,আমরা কাগজে-কলমে স্বাধীনতা পেয়েছি কিন্তু বাংলাদেশ যে এক নতুন শোষণের মুখে পড়েছে, সেটা কি আমরা মানি? তার মানে আমি এটা বলতে চাচ্ছি না আমরা স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে ভুল করেছি, পাকিস্তানের শাস্তি স্বরূপ আমাদের স্বাধীনতা ন্যায্য অধিকার।
আমাদের এখন নিজস্ব অর্থনীতি আছে, আমাদের নিজস্ব জনবল আছে, আমরা ভারত এবং পাকিস্তানপন্থী না হয়ে বাংলাদেশী হয়ে বাঁচতে চাই।কিন্তু চেতনা রাজনীতিবিদরা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য বাংলার জনগণকে দুই দিকে ধাবিত করে, এটাই আমাদের বড় সমস্যা।
আজ বাংলাদেশের বাস্তবতা হচ্ছে, পাকিস্তানি শোষণ অত্যাচার-নিপীড়নের হাত থেকে যুদ্ধের মাধ্যমে রক্ষা পেয়েছি , কিন্ত জায়গা নিয়েছে ভারতীয় প্রেসক্রিপশনভিত্তিক শাসনব্যবস্থা। একদল সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ, যাদের আত্মা ভারতে বন্দী, তারা ভারতের শর্তে দেশ চালায়। তারা শাহবাগের মঞ্চে উঠে দেশপ্রেমের নাটক করে, আবার ভারতের কাছে নতজানু হয়ে দেশকে পরাধীনতার দিকে ঠেলে দেয় আর এরাই হলো শাহবাগী।
শাহবাগ নাট্যশালা ও মুনাফিকদের মুখোশ
২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলনের মঞ্চ ছিল ইতিহাসের অন্যতম ভণ্ড চেতনার নাট্যশালা। সেখানে কিছু “নর্তকী বিপ্লবী” ‘ফাঁসি চাই’ চিৎকারে মানুষের বিচার চেয়েছিল—আইনের পথে নয়, বরং জনরায়ের নামে প্রতিহিংসার রাজনীতি চালিয়েছিল। আলেম-ওলামা, প্র্যাক্টিসিং মুসলিমদের ‘জঙ্গি’ রাজাকার, বলে রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের বৈধতা তৈরি করেছিল।
এই শাহবাগী চেতনার অনুগতরা আজও মুক্তিযুদ্ধের নাম ভাঙিয়ে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করে, গণমাধ্যম ও প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেই কাউকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’, ‘জঙ্গি’ কিংবা ‘পাকিস্তানের দালাল’ বলে আখ্যা দেয়।
৯০% মুসলিমের দেশে মুসলমানরা আজ সংখ্যালঘু?
বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। কিন্তু এখানে মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা আজ প্রশ্নের মুখে। ইসলামের কথা বললেই আপনি মৌলবাদী, দাড়ি রাখলে আপনি সন্দেহভাজন, ইসলামিক রাজনীতি করলে আপনি ‘জঙ্গি’! অথচ এই দেশটা তৈরি হয়েছিল মুসলমানদের রক্ত, ঘাম, চোখের জল দিয়ে।
১৯৭১ সালে যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিল, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিলেন সাধারণ মুসলমান, তাওহিদি জনতা, মসজিদের মুসল্লি, গ্রামের সাধারণ—তাদের নাম আজ ইতিহাসে চাপা পড়ে গেছে।
আর যারা শাহবাগে বসে গান-গল্পে “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” উদযাপন করে, তাদের কতজন যুদ্ধ করেছে, কতজন রণাঙ্গনে রক্ত দিয়েছে—তা যাচাই করা উচিত। যারা ইসলামের বিরুদ্ধ উচ্চারণ করে বলে এই জন্য কি আমারা দেশ স্বাধীন করেছি? সেকুলারিজম প্র্যাকটিস করার জন্য দেশ স্বাধীন হয়েছে , মূলত তারাই সর্বপ্রথম যুদ্ধের সময় ভারতে পালিয়ে গিয়েছিল । এরা এখনো বিপদে পড়লে ভারতে পালায়।
বাংলাদেশ কার? ভারতের না পাকিস্তানের? উত্তর একটাই—বাংলাদেশ বাংলাদেশিদের, বিশেষ করে বাংলাদেশের মুসলমানদের। ৯০% মুসলিমের দেশে ইসলামবিরোধী রাজনীতি, ভারতীয় এজেন্ডা, শাহবাগী প্রোপাগান্ডা—এসব কিছুই বহিরাগত চেতনার আগ্রাসন।
এই দেশ চলবে ইসলামী চেতনায়, সুবিচারে, ন্যায়নীতিতে—not under Indian scripts or foreign ideologies.
যদি সত্যিই বাংলাদেশকে স্বাধীন দেখতে চাও, তবে দাঁড়াও নিজেদের অধিকার নিয়ে, প্রশ্ন করো—কে তোমার স্বাধীনতা কেড়ে নিচ্ছে? কে তোমার বিশ্বাস নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে?
এই দেশকে ভালোবাসা চোখ বন্ধ করে নয়, চোখ খোলা রেখে। “চেতনা” শব্দের চাদরে লুকিয়ে থাকা স্বৈরতন্ত্রকে চিনতে হবে। ভারত-পাকিস্তান নয়, আমাদের স্বার্থই আমাদের রাজনীতির মূল হোক। কে কখন কতটুকু দেশপ্রেমিক ছিল তার চেতনা না দেখিয়ে বর্তমান সময়ে কে কতটুকু দেশপ্রেমিক সেটা যাচাই করা উচিত। কোন রাজনৈতিক দল দেশের জন্য কাজ করে তাকে প্রতিবার সুযোগ করে দেয়া উচিত। আর সুযোগ পেলে সবাই পাকিস্তানের মতো স্বৈরাচার হয়ে অন্যায় অত্যাচার নির্যাতন শুরু করে।
আজ প্রয়োজন একটি সত্যভিত্তিক, আত্মমর্যাদাপূর্ণ রাজনৈতিক চেতনা—যার উৎস হবে ইসলামী ন্যায়নীতি, ইতিহাসের সঠিক বিশ্লেষণ, এবং বাংলাদেশের জনগণের প্রকৃত স্বার্থ। বাংলাদেশ চলবে বাংলাদেশিদের প্রেসক্রিপশনে। কথা লাউড এন্ড ক্লিয়ার। © Delowar Hossen