বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

দুনিয়াজুড়ে আধুনিক যুদ্ধের ধরন পাল্টে গেছে। আজ আর সামনের সীমানায় সেনা পাঠিয়ে যুদ্ধ জয় করা যায় না। যুদ্ধের ময়দান এখন মূলত আকাশ। যার আকাশে দখল থাকবে, যুদ্ধের মাঠেও জয় তারই। ইসরায়েল-ইরান থেকে শুরু করে রাশিয়া-ইউক্রেন, ভারত-পাকিস্তান কিংবা মিয়ানমার-আরাকান সংঘাতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই প্রমাণ করে দিচ্ছে আধিপত্য কার। আর এই জায়গাতেই নাজুক অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

ইসরায়েলের ‘আয়রন ডোম’ বনাম বাংলাদেশের এফএম-৯০

মাত্র কয়েক মাস আগে ইসরায়েলের আকাশে ইরান ৫০০’র বেশি মিসাইল ও ড্রোন ছুঁড়েছিল। ‘আয়রন ডোম’, ‘ডেভিড স্লিং’ আর ‘অ্যারো ৩’-এর মতো মাল্টি-লেয়ারড সিস্টেম দিয়ে ইসরায়েল ৯০% এর বেশি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ঠেকিয়ে দিয়েছিল। পাশের দেশ ভারতও মোতায়েন করেছে রাশিয়ার অত্যাধুনিক এস-৪০০ ও ইসরায়েলের বারাক-৮। পাকিস্তানও ব্যবহার করছে এইচকিউ-৯/পি এবং এলওয়াই-৮০

বাংলাদেশের হাতে আছে শুধু ২০১১ সালে কেনা চীনা এফএম-৯০ স্বল্পপাল্লার মিসাইল। যা মাত্র ১৫-২০ কিলোমিটার দূরত্বের হেলিকপ্টার কিংবা নিচু দিয়ে উড়ে আসা ড্রোন ঠেকাতে সক্ষম। ক্রুজ মিসাইল, স্টিলথ ড্রোন কিংবা ফাস্ট জেটের বিরুদ্ধে কার্যত অকার্যকর।

বিমানবাহিনীর অস্ত্রভাণ্ডার: পুরনো যুগের বিমানের আধিপত্য

বর্তমানে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বহরে আছে ৪৪টি যুদ্ধবিমান। এর মধ্যে ৩৬টি হচ্ছে চীনের পুরনো এফ-৭, আর ৮টি সোভিয়েত যুগের মিগ-২৯। হালকা আক্রমণ কিংবা প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত ইয়াক-১৩০ আছে ১৪টি। অধিকাংশই দ্বিতীয়-তৃতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তি। যেসব আধুনিক রাডার-এভাসিভ বা স্টিলথ এয়ারক্রাফটের মুখোমুখি হলে অকার্যকর।

ড্রোন ও সাবমেরিন শক্তি: সীমিত এবং অসম্পূর্ণ

বাংলাদেশের হাতে আছে মাত্র ৪৪টি ড্রোন। এর মধ্যে ৩৬টি স্লোভেনিয়ান ব্রামর সি-৪আই এবং ৬টি তুরস্কের বায়রাখতার টিবি-টু। যুদ্ধক্ষেত্রে এগুলোর সক্ষমতা খুবই সীমিত। নৌবাহিনীর আছে ২টি সাবমেরিন — চীনের তৈরি। তবে আধুনিক মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিংবা সাবমেরিন প্রতিরোধী প্রযুক্তি এখনও নেই।

কেন বাংলাদেশের আকাশ এতটা উন্মুক্ত?

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে মাঝারি ও দূরপাল্লার সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল সিস্টেমের (SAM) অনুপস্থিতিই মূল সমস্যা। ফলে দেশের আকাশসীমা আজও ৪০-৫০ কিলোমিটার পরই উন্মুক্ত। আরেকটা বড় ঘাটতি মাল্টি-লেয়ার্ড এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম না থাকা। ইরান-ইসরায়েল কিংবা ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ দেখলেই বোঝা যায়, শুধু একটি সিস্টেম দিয়ে আকাশ নিরাপদ রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজন অন্তত ৩ স্তরের প্রতিরক্ষা বলয়।

রাডার ব্যবস্থার দুর্বলতা ও সাম্প্রতিক উন্নয়ন

বাংলাদেশে এখনো ড্রোন কিংবা ক্রুজ মিসাইল শনাক্ত ও প্রতিহত করার পর্যাপ্ত রাডার কভারেজ নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিমানবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে জিএম-৪০৩ এম রাডার। ড্রোন শনাক্তে ‘কাউন্টার ড্রোন সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম’ কেনার কথাও চলছে। কিন্তু এসব দিয়ে আধুনিক সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা বলয় গড়া সম্ভব নয়।

কারণ অর্থনীতি না ইচ্ছার ঘাটতি?

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর সাফ বলেছিলেন — ‘আমাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জিরোর কাছাকাছি।’ গত ১৬ বছরে বাহিনীর বাহারি ড্রিল আর চোখ ধাঁধানো সামরিক শোভাযাত্রা হলেও কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ায় তেমন নজর দেওয়া হয়নি। মূল সমস্যা বাজেট নয়, বরং সঠিক বণ্টন ও অগ্রাধিকার।

কী করতে হবে এখনই?

১. মাল্টি-লেয়ার্ড এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম চালু করা
২. দূরপাল্লার ক্রুজ মিসাইল ডিফেন্সঅ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম সংগ্রহ
৩. আধুনিক ফাইটার জেট ও অ্যাটাক হেলিকপ্টার যুক্ত করা
4. দেশীয় ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা
৫. সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় বাড়ানো

শেষ কথা: প্রস্তুতি এখনই না নিলে ভয়াবহ বিপদ

এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেনের কথা একেবারে সত্য — ‘যার আকাশে দখল, যুদ্ধ তারই।’ ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ভারত-পাকিস্তান সংঘাত বাংলাদেশের জন্য চোখ খুলে দেওয়ার মতো শিক্ষা।
বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষায় এখনই বড় বিনিয়োগ, আধুনিকায়ন ও কৌশলগত পরিকল্পনা না করলে একদিন এই নাজুকতা আমাদের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।

আপনার মতামত কী? আপনি কি মনে করেন বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষায় এখনই আধুনিক মাল্টি-লেয়ার সিস্টেম প্রয়োজন? নিচে কমেন্ট করুন।

Thanks For Comment we are reply soon as possible.

Previous Post Next Post