ধেয়ে আসছে গাজওয়াতুল হিন্দ — সত্য নাকি মিথ্যা?

ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে, যা যুগে যুগে মুমিনদের হৃদয়ে আশা, প্রস্তুতি ও আত্মত্যাগের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো "গাজওয়াতুল হিন্দ"—হিন্দুস্তানে সংঘটিত এক মহাযুদ্ধের ভবিষ্যদ্বাণী, যা ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মুখনিঃসৃত। এই যুদ্ধের ব্যাপারে অনেক হাদিস এসেছে, যার কিছু সহিহ, কিছু হাসান, আবার কিছু জইফ (দুর্বল)। তা সত্ত্বেও, এ যুদ্ধের গুরুত্ব, মর্যাদা ও লক্ষ্য নিয়ে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিস্তর আলোচনা এবং আগ্রহ রয়েছে।

তবে প্রশ্ন হলো, গাজওয়াতুল হিন্দ আদৌ সত্য, না কি এটি একটি অতিরঞ্জিত কল্পনা? এ যুদ্ধ কি ইতোমধ্যেই ঘটে গেছে, না কি অদূর ভবিষ্যতে ঘটবে? আমাদের এই ব্লগে আমরা হাদিসসমূহ, ইসলামী পণ্ডিতদের মতামত এবং বর্তমান বিশ্বের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে গাজওয়াতুল হিন্দ নিয়ে বিশ্লেষণ করব ইনশাআল্লাহ।


গাজওয়াতুল হিন্দ: হাদিসের আলোকে

‘গাজওয়া’ শব্দের অর্থ হলো যুদ্ধ এবং ‘হিন্দ’ বলতে বুঝানো হয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশ—যার অন্তর্গত বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা। গাজওয়াতুল হিন্দ নিয়ে বহু সাহাবি থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, শেষ যুগে মুসলমানদের একটি দল হিন্দুস্তানে যুদ্ধ করবে এবং আল্লাহ তাদের বিজয় দান করবেন। এ যুদ্ধ হবে একটি মর্যাদার যুদ্ধ, যাতে শহিদদের মর্যাদা ও গাজিদের মুক্তির প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

হাদিসে এসেছে—

“তোমাদের একটি দল হিন্দুস্তানে যুদ্ধ করবে। আল্লাহ তাআলা তাঁদের বিজয় দান করবেন। তাঁরা হিন্দুস্তানের রাজাদের শিকল দিয়ে টেনে আনবেন। তারপর তারা শামে ফিরে আসবে এবং ঈসা আ.-এর সঙ্গে মিলিত হবেন।”
— (মুসনাদে আহমাদ, হাদিসে আবু হুরাইরা রা.)

এছাড়াও আবু হুরাইরা (রা.) সহ অন্যান্য সাহাবিরা এই যুদ্ধের অংশগ্রহণের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন এবং এটিকে শহীদ ও মুক্তির উপায় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।


যুদ্ধটি কখন সংঘটিত হবে?

এটি নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ বলেন, এই যুদ্ধ অতীতে হয়ে গেছে — যেমন মুহাম্মদ বিন কাসিম রহ. এর সিন্ধু অভিযান বা মাহমুদ গজনভির ভারত আক্রমণ। কিন্তু অধিকাংশ আলেমের মতে, গাজওয়াতুল হিন্দ এখনও সংঘটিত হয়নি। কারণ, হাদিসে বর্ণিত কিছু নিদর্শন যেমন—

ইসা আ.-এর আগমনের সময়কাল

দাজ্জালের আবির্ভাবের পূর্ব মুহূর্ত
মুসলিম মুজাহিদদের সিরিয়া ফিরে গিয়ে ঈসা আ.-এর সাথে যুদ্ধ করা

— এইসব বিষয়গুলো এখনো ভবিষ্যতের অন্তর্গত।

শাইখ সালিহ আল-মুনাজ্জিদ বলেন, “যদি হাদিসগুলো সহিহ হয়, তবে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় যে, গাজওয়াতুল হিন্দ শেষ যুগে, ইমাম মাহদির যুগে সংঘটিত হবে।”


বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গাজওয়াতুল হিন্দ

আজকের বিশ্বের দিকে তাকালে অনেকেই গাজওয়াতুল হিন্দের আলামত খুঁজে পান। যেমন—

কাশ্মীরে সাত লক্ষাধিক ভারতীয় সেনা মোতায়েন
ভারত-পাকিস্তান এবং ভারত-বাংলাদেশের পানি সংকট, সীমান্ত উত্তেজনা
ভারতের ভেতরে মুসলিমদের উপর নির্যাতন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, বাবরি মসজিদের ধ্বংস
ভারতের ‘সেভেন সিস্টারস’ অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন
উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি ও মুসলিমবিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ড

এসব ঘটনা অনেকের মতে শেষ যামানার সেই যুদ্ধের পূর্বসংকেত হতে পারে। তদুপরি, আজকের মুসলিম উম্মাহ যেভাবে আত্মমগ্ন, বিভক্ত ও দুর্বল — এ অবস্থায় তাগুতি শক্তির দিক থেকে আক্রমণের আশঙ্কা অত্যন্ত প্রবল।


কি হবে এ যুদ্ধে?

হাদিস অনুসারে, গাজওয়াতুল হিন্দ একটি ঐশী প্রতিশ্রুত যুদ্ধ, যেখানে মুসলমানরা বিজয় লাভ করবে, শত্রুপক্ষকে শিকল পরিয়ে ফিরিয়ে আনবে এবং অংশগ্রহণকারী মুজাহিদরা ক্ষমাপ্রাপ্ত ও জাহান্নাম থেকে মুক্ত ঘোষণা পাবেন। তাদের অনেকেই ঈসা আ.-এর নেতৃত্বে দাজ্জালের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধে শরিক হবেন।

তবে এটি হবে সর্বশেষ যুদ্ধের পূর্বসূচনা — খিলাফতের পুনরুত্থান, ইমাম মাহদির আগমন, এবং দাজ্জালের বিরুদ্ধের চূড়ান্ত সংগ্রামের পূর্ববর্তী অধ্যায়।


আমাদের করণীয় কী?

এই যুদ্ধ কখন ঘটবে তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। তবে, হাদিস ও ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করা কর্তব্য। প্রস্তুতি মানে কেবল অস্ত্র বা বাহিনীর প্রস্তুতি নয়; বরং ঈমান, তাকওয়া, ঐক্য, চিন্তা-ভাবনা ও কৌশলগত দিক থেকে প্রস্তুত হওয়া জরুরি।

বর্তমানে মুসলিম উম্মাহ আত্মগর্হিত দ্বন্দ্বে নিমজ্জিত। কাফির শিবির তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও মানসিক দিক দিয়ে মুসলিম ভূমিগুলো দখল করছে। ইসলাম, মুসলমান ও খিলাফতের ধারণাকে তারা ধ্বংস করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ অবস্থায় গাজওয়াতুল হিন্দের ভবিষ্যদ্বাণী আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার মতো হওয়া উচিত।


গাফিলতা নয়, প্রস্তুতির সময়

গাজওয়াতুল হিন্দ সত্য না মিথ্যা — প্রশ্নটি যদি বিশ্বাসের প্রশ্ন হয়, তাহলে হাদিসসমূহ আমাদের অনেকটাই পরিষ্কার ধারণা দেয় যে এটি সত্য এবং ভবিষ্যতে ঘটবে। আর যদি প্রশ্নটি সময়ের — তাহলে বলা যায়, তা এখনো ঘটেনি, তবে সম্ভাব্যতা দিনদিন প্রবল হচ্ছে।

এটি এমন এক যুদ্ধ, যেটি মুসলমানদের জন্য শুধু রণক্ষেত্রের নয়, বরং ঈমান, তাকওয়া, আত্মত্যাগ এবং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রাণ বিসর্জনের এক আলোকিত মঞ্চ।

আসুন, আমরা আত্মসমালোচনা করি, প্রস্তুত হই, এবং দোয়া করি—
যদি এ যুদ্ধ আমাদের যুগেই ঘটে, আমরা যেন তার সঠিক দিক চিহ্নিত করে তাতে অংশগ্রহণের হিম্মত ও তাওফিক লাভ করি।

হে আল্লাহ! তুমি আমাদের আত্মিক নিদ্রা থেকে জাগিয়ে দাও, দ্বীনের সঠিক বুঝ দাও, এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে আমাদের দৃঢ় রাখো। আমীন।

Thanks For Comment we are reply soon as possible.

Previous Post Next Post