বিউটিফুল ইসলাম পর্ব ১: ইসলামের সৌন্দর্য

বিউটিফুল ইসলাম




আসসালামু আলাইকুম, সম্মানিত প্রিয় পাঠক; ইসলামের সৌন্দর্য মানুষের সামনে তুলে ধরার জন্যই বিউটিফুল ইসলাম বইটি তৈরি করা। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম এর জীবন ব্যবস্থা তৎক্ষণার যুগের আরবের বর্বরতা সমাজকে পরিবর্তন করে এক স্বর্ণালী অধ্যায় রচনা করেন। আপনার বরের মনোনীত ধর্ম ইসলাম হলো কুরআন-হাদিসে পরিচালিত একেশ্বরবাদী ধর্ম ও জীবনপদ্ধতি। ইসলামকে আমরা শুধু ধর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাই কিন্তু আপনার রব এটি সমগ্র জ্বীন ও মানবজাতির জন্য শান্তির বার্তা এবং মানব জাতির হেদায়েত স্বরুপ নাজিল করেছেন। আশা করি এই বইটি সম্পূর্ণ মনোযোগ সহকারে পড়ে ইসলামের সৌন্দর্য লক্ষ্য করতে পারবেন।

সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে জীবনের সব কষ্ট সয়ে নেন পিতামাতা। সন্তানের জন্য বিসর্জন দেন নিজের শত শখ-আহ্লাদ। কিন্তু যাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য আপনি দিনের পর দিন খেটে যাচ্ছেন তাদের জীবনকে যে বিষিয়ে দেবার আয়োজন করা হয়েছে সুপরিকল্পিতভাবে - তা কি আপনি জানেন?  দিনদিন মুক্তচিন্তা, সমকামী, নারীবাদ, সংশয়বাদী চিন্তাধারা প্রসার ঘটছে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে সর্বপ্রথম কিছু মানুষ নিজেদের নাস্তিক বলে স্বীকৃতি দেয়। বর্তমান বিশ্বের জনসংখ্যার ২.৩% মানুষ নিজেদের নাস্তিক বলে পরিচয় দেয় এবং ১১.৯% মানুষ কোন ধর্মেই বিশ্বাস করে না। জপানের ৬৪% থেকে ৬৫% নাস্তিক বা ধর্মে অবিশ্বাসী। রাশিয়াতে এই সংখ্যা প্রায় ৪৮% এবং ইউরোপিয় ইউনিয়নে ৬% (ইতালি) থেকে শুরু করে (সুইডেন) ৮৫% পর্যন্ত।

 

ইসলাম-পূর্বে নারীরা ছিল অত্যন্ত অসহায়। তাদের ব্যাপারে বুদ্ধি ও যুক্তিসঙ্গত কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হত না। একমাত্র বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (স) নারী জাতির প্রকৃত মুক্তি ও স্বাধীনতা দিয়েছেন। দিয়েছেন পূর্ণ অধিকার ও মর্যাদা। কিন্তু আজকে পশ্চিমা কালচারের কল্যাণে ভয়ংকর এক নারী প্রজন্মের অপেক্ষায় আমরা! ৭০ থেকে ৮০% উচ্চ শিক্ষিত মেয়ে ২৭ থেকে ৩০ বয়সেও বিয়েহীন। পশ্চিমা কালচারের অনুকরণে ক্যারিয়ার তৈরিতে মেয়েরা এমন এক সংকট তৈরী করেছেন। নিজের পায়ে দাঁড়ানো জন্য আগামী ৫,১০ বছরে লাখ লাখ মেয়ে বিয়েহীন থাকবে৷ ফল স্বরুপ দেখা দিবে পরিবারে অশান্তি, বিবাহ বিচ্ছেদ, অবাধ যৌনাচার, পরকিয়া ইত্যাদি মতো বড় বড় সমস্যা। নষ্ট হয়ে যেতে পারে পরিবার ব্যবস্তা, সন্তানদের পরিচয় হয়ে যেতে পারে মাতৃতান্ত্রিক। বিবাহ ছাড়া লিভিং সম্পর্ক এটা শুধু ধর্মের জন্য ক্ষতিকর নয় সমাজের জন্য ক্ষতিকর,ফলস্বরূপ ঝারজ সন্তানের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাবে।

 

ইসলামে শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো আদম সন্তানকে মানুষরূপে গড়ে তোলা। যে শিক্ষা আত্মপরিচয় দান করে, মানুষকে সৎ ও সুনাগরিক হিসেবে গঠন করে এবং পরোপকারী, কল্যাণকামী ও আল্লাহর প্রতি অনুরাগী হতে সাহায্য করে, সে শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা। তাছাড়াও মুসলিম শাসকরা সারা বিশ্বের সব অঞ্চলের বিলুপ্তির শিকার জ্ঞান, শিক্ষা ও ভাব সম্পদকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে জিইয়ে রেখেছেন।

 

দুর্ভাগ্যক্রমে এক দেড়শ’ বছর কিংবা আরো বড় ফ্রেমে আড়াই থেকে তিনশ’ বছর ধরে মুসলিম জাতি বিশ্বের সকল বিদ্বেষী ও শত্রুর দ্বারা চরমভাবে আক্রান্ত ও পর্যুদস্ত। শত্রুর চতুর্মুখী ও সম্মিলিত এমন আক্রমণে, আল্লাহ তায়ালার কোরআন ও দীন হেফাজতের ওয়াদা থাকায় এবং দীনের বাতিকে পূর্ণতা দানের চ্যালেঞ্জ থাকায় কেবল ইসলামই নিজের অস্তিত্ব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে দুনিয়ার আর কোনো ধর্ম, দর্শন বা মতবাদ নিঃসন্দেহে নির্মূল হয়ে যেত। ইসলাম শত্রুর ষড়যন্ত্র ও ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়েছে বটে, তবে এক সেকেন্ডের জন্যও থমকে দাঁড়ায়নি। ইসলাম ও মুসলিম জাতি আল্লাহর চিরন্তন ও শেষ বিধানের বাহক। অতএব, এটি ধ্বংস করা যাবে না। কবি ইকবালের ভাষায় মুসলমান পৃথিবীতে সূর্যের মতো বিচরণ করছে। কোথাও ডুবে যায়, কোথাও উদিত হয়।

 

আধুনিক সময়ের প্রতিযোগিতায় মুসলিমদের দুঃসময়ে তারা হয়তো খানিকটা পিছিয়ে পড়ে থাকবে। কিন্তু তারাই মূল পাইওনিয়ার। তারাই পথিকৃত। সময়ের ব্যবধানে বিশ্বের পাদপ্রদীপের আলোয় এখন থেকে আবার মুসলিমদেরই দেখা যাবে ইনশাআল্লাহ। কারণ, মানবতার জন্য কোনো ঐশী বার্তা বহন করে না এমন প্রাণহীন, পয়গামহীন, মনুষ্যত্ব ও নৈতিকতাহীন, জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্য অজানা লোকেদের হাতে বিশ্ব নেতৃত্ব বেশি দিন থাকতে পারে না। আল্লাহর ফযলে এমন একটি জ্বলন্ত জাগরণ একবিংশ শতাব্দীজুড়েই ধীরে ধীরে মানুষের ভাবনার, দৃষ্টির ও অভিজ্ঞতার দিগন্তে সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে।

 

পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়ম এটাই যে, যেই ইটগুলো দ্বারা ইমারতের ফাউন্ডেশন দেয়া হয় তা কখনই ভবনের সৌন্দর্য প্রকাশে অংশগ্রহন করতে পারে না। আকাশের দিকে মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটি দেখে মানুষ মুগ্ধ হয় কিন্তু বেমালুম ভুলে যায় সেই কাদামাখা প্লাষ্টারবিহিন ইটগুলোর কথা যার উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে চকচকে বিল্ডিং। বর্তমান যুগের বিজ্ঞান শাস্ত্রেও তার বিকল্প ঘটে নি। আধুনিক বিজ্ঞান আজ ডারউইনের মতবাদকে প্রমাণ করার ব্যর্থ প্রয়াসে মত্ত। জাবির ইবনে হাইয়ান কিংবা আল হাসানের মত বিজ্ঞানীদের নিয়ে স্টাডি করার সময় আধুনিক বিজ্ঞানের নেই। তাইতো ফাউন্ডেশনে ব্যবহৃত ইটগুলো পরে থাকে লোকচক্ষুর অন্তরালেই। কেউ এদের পালিশ করে চকচকে রাখে না। আল্লাহ মানুষ সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই মানুষের ব্রেইনের মধ্যে গেঁথে দিয়েছেন বিজ্ঞানের ভাবনা।

 

 মুসলিম উম্মার এই ক্লান্তিলগ্নে বিউটিফুল ইসলাম বইটিতে মিলবে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য, মুসলমানদের গর্বিত ইতিহাস এবং ইসলামের সুন্দর নিয়ম-নীতি সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই বইটিতে। আমরা মনে করি, ইসলাম হলো শুধু সালাত পড়া, রোজা রাখা, হজ করা, জাকাত দেয়া। মূলত ইসলাম হলো আমাদের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সমাজ, রাষ্ট্র, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক,জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইসলামের সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ। ইসলাম যে পূর্ণাঙ্গ এক জীবনব্যবস্থা সেটি আমরা মানতে চাই না কারণ আমাদের চোখে পশ্চিমা কালচারের রঙ্গিন চশমা পরিধান করে দেওয়া হয়েছে। এই বইটির মাধ্যমে প্রিয় পাঠকের রঙ্গিন চশমা টা সরিয়ে বাস্তবিক চিন্তা চেতনায় ইসলামের সুন্দর্য অনুভব করার চেষ্টা করা হয়েছে।

 আপনার রব চান আমাদের পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ, রাষ্ট্র, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রতিটি ক্ষেত্রেই আল্লাহর কুরআন ও নবী মুহাম্মদ সা:-এর হাদিস অনুসারে সার্বিক পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় ইসলাম প্রেকটিস করা হক আর এটাই আমাদের জন্য উত্তম জীবন ব্যবস্তা। শুধু সালাত-সিয়ামে ইসলাম সীমাবদ্ধ নয়। ইসলামের পরিধি ব্যাপক, বিস্তৃত। ইসলামের প্রসারণ আমাদের জন্ম থেকে মৃত্যু, দোলনা থেকে কবর, পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত। আমাদের ইহকালীন-পরকালীন মুক্তি, শান্তির জন্য ইসলামই একমাত্র জীবনব্যবস্থা ও পথপ্রদর্শক।

ইসলাম ধর্ম হল সমগ্র জ্বীন ও মানবজাতির জন্য শান্তির বার্তা, সুশৃঙ্খল, পরিপাটি, সাজানো-গোছানো এক জীবনব্যবস্থা। ইসলামকে শুধু ধর্ম বলে ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করতে চাই না। যার ফলস্বরূপ বিউটিফুল ইসলাম বইটিতে আমি ইসলামের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। ইসলাম শুধু পাঁচটি স্তম্ভেই সীমাবদ্ধ নয়। এর পরিসর আরো ব্যাপক, বিস্তৃত। আমাদের পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনা- সব ক্ষেত্রেই ইসলাম আবশ্যক ভূমিকা পালন করে। পরিবারের সবার সাথে ভালো ব্যবহার করা, গরিব-এতিমের সাথে ভাল আচরণ, সমাজের একে অন্যের খোঁজখবর নেয়া সব ক্ষেত্রেই ইসলামের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ব্যক্তির আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণ, কথার মাধুর্য সবখানেই ইসলামের গুরুত্ব, প্রভাব রয়েছে।

ইসলাম মানুষকে মুক্তির আহ্বান করে, আত্মার পরিশুদ্ধি করে। ব্যক্তির প্রতি ব্যক্তির বিশ্বাস, ভালোবাসা তৈরি করে। প্রতিবেশীর হক আদায়, তাদের খোঁজখবর নেয়া থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কাজে সাহায্য করা, রোগ শোকে পাশে থাকা ইত্যাদি কাজের নির্দেশনা দেয় ইসলাম। পরিপূর্ণ ইসলামে প্রবেশ করলে মানুষের ইহকালে ও পরকালে মুক্তি মিলবে।

ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত রাষ্ট্রনায়ক ধনী-গরিব, আত্মীয়-অনাত্মীয়, উঁচু-নিচুর মধ্যে কখনো পার্থক্য করবে না। তার মনে স্বজনপ্রীতির কোনো স্থান থাকবে না। ব্যক্তির নিজ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় কাজের দায়িত্ব পাবে, সে দলীয় বা বিরুদ্ধ দলীয় লোক হলেও। ইসলামই নারীকে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী করেছে। নারীর অধিকার রক্ষায় পুরুষ সবসময়ই সোচ্চার থাকবে।

মোটকথা, বলতে গেলে, ইসলাম মানুষকে সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করে। ইসলামী আদর্শে জীবন পরিচালনা করলে ইহকালে যেমন শান্তিতে বসবাস করতে পারে তেমনি পরকালের কল্যাণের পথও সুগম হয়। আমরা যেন ইসলামকে শুধু ধর্ম মনে না করে, একে ক্ষুধা গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ না রেখে, ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের বাইরেও চিন্তার প্রসারতা ঘটাই। ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য পেতে হলে আমাদের পুরোপুরি ইসলামে প্রবেশ করতে হবে। ইসলামের কিছু মানলাম আর কিছু মানলাম না, নিজের মনমতো ইসলাম মানলে, নিজের ইচ্ছেমতো চললে, ইসলামের সৌন্দর্য, স্বাদ উপভোগ করা যায় না।

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে সূরা বাকারাহর ২০৮ নম্বর আয়াতে নিজেই বলেছেন- ‘হে মুমিনরা, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের জন্য প্রকাশ্য শত্রু।’ সুতরাং আমাদের আল্লাহর কথা মেনে পরিপূর্ণ মু’মিন হয়ে ইসলামে প্রবেশ করতে হবে। আমরা যা করি তা-ই আমাদের কর্মফল, আমরা পুনরুত্থানের দিনে আমাদের কর্ম অনুযায়ী ফল পাবো। ভালো কাজের জন্য জান্নাত, খারাপ কাজের জন্য জাহান্নাম। তাই আমাদের এই সুশৃঙ্খল জীবনব্যবস্থা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে হবে। ভালো কাজে আদেশ, মন্দ কাজে নিষেধ করে ইসলামী সৌন্দর্যের আলোকে নিজে, পরিবার, সমাজ রাষ্ট্র কায়েম করতে হবে। 


Thanks For Comment we are reply soon as possible.

Previous Post Next Post