এক দেশে ছিল এক বিশাল বন, নাম গন্ডারপুর। এই বনে বহু প্রাণী বাস করত—কেউ গাছের ছায়ায় ঘুমাত, কেউ নদীতে সাঁতার কাটত। বনটা একসময় শান্ত ছিল, নিরীহ ছিল, সবাই মিলে খেত-দেত, গান গাইত।
কিন্তু একদিন এই বনে রাজা হল গন্ডার। সে এতই মোটা চামড়ার ছিল যে কেউ কিছু বললেই বলত, “তুমি চক্রান্ত করছো বনবিরোধীদের হয়ে!”
প্রথমদিকে সবাই ভাবল—ভালই তো! গন্ডার শক্তিশালী, নিশ্চয়ই বনের উন্নতি হবে।
কিন্তু গন্ডার তো শুধু নিজের পেছনে ঘাস লাগায়, নিজের পুকুরে জল ভরায়, নিজের ছানাদের মধুর চাক দেন।
সে বলত, “আমি তো বনের মা-বাবা! আমি ছাড়া এই বন ধ্বংস হয়ে যাবে।”
একদিন হরিণ বলল, “এই যে, গাছগুলো কেটে দিচ্ছেন, এটা বন ধ্বংস করছে।”
গন্ডার উত্তর দিল, “তুমি তো রাজহরিণের দালাল! বনবিরোধী ষড়যন্ত্রকারী!”
অপরদিকে বানররা গান গাইত, “গন্ডার চেতনায় বাঁচে গন্ডারপুর!”
তাদের চোখে গন্ডার কোনো ভুল করতেই পারে না।
যদি গন্ডার কারো ঘর গুঁড়িয়ে দেয়, তারা বলে—“ভালোই করেছে, সে তো বনের শত্রু ছিল।”
যদি গন্ডার নিজেরা বনের নিয়ম ভাঙে, তারা বলে—“নিয়ম বদলাতেই হয় উন্নতির জন্য!”
গন্ডারদের একটা মজার অভ্যাস ছিল—নিজেরা অপরাধ করলে মুখ বুজে থাকে, অন্য কেউ নাক টানলেও বলে, ‘এটা এক ভয়াবহ অপরাধ!’
একবার বনের বুড়ো কচ্ছপ গাছের নিচে বসে বলল,
“এভাবে চললে বনটা তো একদিন উজাড় হয়ে যাবে।”
তৎক্ষণাৎ তার নামে রটানো হল,
“সে আসলে লতা-পাতা ভক্ষণকারী দলের গুপ্তচর!”
গন্ডার শুধু নিজের দোষ দেখে না, বরং আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলত, “আমি তো এই বনের রক্ষা-কর্তা!”
তার চারপাশে যারা ছিল, তারা ছিল ‘চাপা-মারার প্রজাতি’—তারা গন্ডারের প্রত্যেক ভুলকে ব্যাখ্যা করে "সর্বোৎকৃষ্ট সিদ্ধান্ত" হিসেবে।
একদিন বনবাসীরা মিলে প্রতিবাদ করল, বলল—“আমরা শান্তি চাই, ন্যায় চাই।”
গন্ডার বলল,
“তোমরা অশুভ শক্তি! বনের উন্নয়ন বিরোধী, তোমাদের জায়গা জঙ্গলে নয়, জেলে।”
গন্ডার এতটাই অভ্যস্ত ছিল নিজেকে “পরম সত্য” ভাবতে, যে সে মনে করত— “আমি গন্ডার না, আমি ধর্ম! আমি চেতনা! আমি ইতিহাস!”
তার অনুসারিরাও বলত,
“গন্ডারের বিরুদ্ধে কথা মানেই বনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ!”
এভাবে চলতে চলতে গন্ডারপুরে বনের রং ম্লান হয়ে গেল, গাছ শুকিয়ে গেল, নদী শুকিয়ে গেল।
কিন্তু গন্ডার আর তার দল এখনও বলছে—
“দেখো, কত উন্নয়ন! কত মধু! কত শান্তি!”
তাদের চোখে গন্ডার মানেই গর্ব, গন্ডার মানেই বাঁচন, আর গন্ডার মানেই সত্য।
আর যারা প্রশ্ন করে—তারা “ষড়যন্ত্রকারী”।
এটাই গন্ডারের চেতনার রাজনীতি—যেখানে সত্য লুকিয়ে থাকে মোটা চামড়ার নিচে,
আর অপরাধ ঢেকে দেওয়া হয় “উন্নয়ন”, “দেশপ্রেম”, “অবিচল নেতৃত্ব” নামক মুখোশে। © Delowar Hossen