বিয়ে এক রাতের জন্য নয়, জীবনের জন্য

 বিয়ে এক রাতের জন্য নয়, জীবনের জন্য:-

বিয়ে কোনো নাটক না, কোনো রোমান্টিক ফ্যান্টাসিও না—এটা বাস্তবতা। প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি নিঃশ্বাসে জড়িয়ে থাকা একটা সিদ্ধান্ত। অনেকে ভাবে, বিয়ে মানে কেবল রাতের কিছু মুহূর্তের রঙিন অনুভূতি, অথচ বাস্তবতা হলো—দিনের বাকি ২৩ ঘন্টা ৩০ মিনিটের হিসেবটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


আজকাল অনেকেই বিয়ে করছে, কিন্তু “কেন বিয়ে করছে?” সেই প্রশ্নের উত্তর তাদের কাছে নেই। কেউ করছে সমাজে স্ট্যাটাস তৈরি করতে, কেউ আবেগে, কেউ শখে, কেউবা ঠ্যালায় পড়ে। অথচ বিয়ে এমন একটা চুক্তি—যেটা শুধু দুইজন মানুষকে এক করে না, বরং দুইটা জীবনকে সম্পূর্ণভাবে একসূত্রে বেঁধে ফেলে।

জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাই খুব সতর্ক হওয়া জরুরি। শুধুমাত্র চোখের ভালো লাগা দিয়ে, কিছু দিনের আবেগ দিয়ে, কিংবা সামাজিক চাপের কারণে যদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে এক সময় তার চড়া মূল্য দিতে হতে পারে। কারণ, নিজেকে না বুঝে বা মূল্যায়ন না করে যার-তার সঙ্গে সংসার বাঁধলে, শেষমেশ জীবনটাই তছনছ হয়ে যেতে পারে।


বিয়ের মূল প্রয়োজনীয়তা কী?

বিয়ে শুধু শারীরিক সম্পর্কের বৈধতা অর্জনের নাম নয়। এটি হলো একজন সঙ্গী পাওয়া, যে আপনার বন্ধু হবে, রুমমেট হবে, জীবনের প্রতিটি ওঠানামায় পাশে থাকবে। তাই যদি মানসিকতা, চিন্তা-চেতনা, জীবনের উদ্দেশ্য ও মূল্যবোধের জায়গায় বিস্তর পার্থক্য থাকে, তাহলে সেই সম্পর্ক একটা বোঝায় পরিণত হয়। অনেক সময় সেই বোঝা এতটাই ভারী হয়ে যায় যে মানুষ বিচ্ছেদ নামক নির্মম সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়।


দু'জন মানুষ কখনো একরকম হবে না—এটা যেমন সত্য, তেমনি একে অপরকে না বুঝতে পারলে দূরত্ব তৈরি হওয়াটাও বাস্তবতা। ছোটখাটো বিষয়—রাতের খাবার দেরিতে খাবে না আগেভাগে, ঝাল কম পছন্দ না বেশি—এই জায়গাগুলোতে ছাড় দেওয়া যায়। কিন্তু যদি মৌলিক চিন্তা, বিশ্বাস, লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের জায়গায় অসামঞ্জস্য থাকে, তাহলে সেটার প্রভাব সারা জীবনে পড়ে।


ভালোবাসার সঠিক রূপ:

সঙ্গীকে ভালো না লাগলে বিয়ে অর্থহীন। শুধু 'বিবাহিত' ট্যাগ কাঁধে ঝুলে থাকবে, কিন্তু হাতে থাকবে না প্রিয় মানুষের উষ্ণ স্পর্শ। অথচ, জীবনের দুঃখ-হতাশা মুছে দিতে যখন কাঁদতে ইচ্ছা করে, তখন একটা কাঁধের প্রয়োজন হয়। যে কাঁধে মাথা রাখলে সব ব্যথা হালকা লাগে। সেই কাঁধটাই জীবনসঙ্গী হয়ে ওঠে, যদি সে হয়ে ওঠে একজন প্রকৃত সাথি।


ভালোবাসা মানে শুধু দাবি করা নয়। অনেক সময় নিজের ভালোবাসাকে বিসর্জন দিতে হয় প্রিয় মানুষটির সন্তুষ্টির জন্য। তবে সেই ত্যাগ যেন অন্যায়ের প্রশ্রয় না হয়, তা-ও খেয়াল রাখা জরুরি।


নীরব ভালোবাসা: বোঝাপড়ার চরম পর্যায়-

সফল দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি বোঝাপড়া। কেউ মুখে না বলেও বুঝে নেয়—এটা রাগ না অভিমান, এটা মন খারাপ না ভেতরের কষ্ট। এই বোঝাপড়া রাতারাতি আসে না। এটা ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে—ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর মানসিক পরিপক্বতার মাধ্যমে।


এমন সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়, যেখানে দুজন মানুষ নিজের ভেতরের সত্তার সঙ্গে সঙ্গীর ভেতরের সত্তার নীরব কথোপকথনে পথ চলে। তারা সংসার করে, যেমন সব দম্পতি করে। কিন্তু তাদের মধ্যে চলে এক অস্পষ্ট কিন্তু গভীর প্রচেষ্টা—কীভাবে একে অপরকে সুখী রাখা যায়। কী তার চাওয়া, কী সে পছন্দ করে, কী তাকে কষ্ট দেয়—সব জানার জন্য এক ধরনের আত্মিক প্রচেষ্টা।


ভালোবাসা মানে একসাথে বেড়ে ওঠা:

বিয়ে কোনো প্রতিযোগিতা নয়। স্বামী-স্ত্রী প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। তারা একে অপরের সবচেয়ে কাছের বন্ধু, সবচেয়ে নির্ভরতার জায়গা। তারা একে অপরের জন্য নিরাপদ আশ্রয়। ভালোবাসার সংসার হলো চর্চার বিষয়, এটা গড়ে ওঠে সময় নিয়ে, মমতা দিয়ে, আন্তরিকতা দিয়ে।

তাই বিয়ের আগে শুধু বাহ্যিকতা নয়, বরং ভেতরের মানসিকতা, মূল্যবোধ, জীবনদর্শনের মিল খোঁজা উচিত। তাহলে সংসার হবে ভালোবাসায় পূর্ণ—একটি শান্ত, সুন্দর ও সার্থক জীবনযাত্রার নাম।


 জীবনসঙ্গী মানে শুধু একজন মানুষ নয়, সে একজন নির্ভরতার প্রতীক। তাই বিয়ের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমি কি তাকে শুধু চাই, নাকি তাকে বোঝতেও প্রস্তুত? কারণ, বিয়ের পর জীবনটা একসাথে কাটাতে হয়, প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্ত। আর সেই জীবনটা যেন ভালোবাসার হয়, বোঝাপড়ার হয়—এই কামনায়। © Delowar Hossen

Thanks For Comment we are reply soon as possible.

Previous Post Next Post